Logo
×

Follow Us

জাতীয়

রোহিঙ্গা সংকটের দায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে নিতে হবে : শামা ওবায়েদ

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৪:১৬ পিএম

রোহিঙ্গা সংকটের দায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে নিতে হবে :  শামা ওবায়েদ

ছবিঃ সংগৃহীত

 তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে যাবে, তবে সংকটের পুরো বোঝা একা বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।

রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীতে ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) ও অক্সফাম ইন বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে ‘রোহিঙ্গা সংকটের ১০ বছর: মানবিক সহায়তা থেকে টেকসই সমাধানের পথে’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের প্রায় এক দশক পূর্তি শুধু অতীত পর্যালোচনার বিষয় নয়, এখন কার্যকর উদ্যোগ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সময়। আরেকটি দশক যেন একই পরিস্থিতির মধ্যে না কাটে, সে জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

তিনি বলেন, একটি সরকারের জন্য ১০ বছর একটি নীতিচক্রের সময় হলেও শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর জন্য এই সময়টিই তার পুরো শৈশব। তরুণদের জন্য এটি শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় হারিয়ে ফেলা এবং একটি পরিবারের জন্য দীর্ঘ এক দশক ঘরহীন জীবন। তাই এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক আগমনের পর থেকে বাংলাদেশ মানবিক কারণে সীমান্ত ও হৃদয় উন্মুক্ত রেখেছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সীমিত ভূমি, উচ্চ জনঘনত্ব ও নিজস্ব উন্নয়ন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশ বর্তমানে ১২ লাখের বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছে।

বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের অবকাঠামো, পরিবেশ, জনসেবা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি। এরপরও মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে রোহিঙ্গাদের খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা, শিক্ষা ও সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের মানবিক সহায়তাকে আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তার কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন শামা। তার ভাষায়, বাংলাদেশ আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু যে সংকট বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি, তার স্থায়ী সমাধান একা বাংলাদেশের পক্ষে করা সম্ভব নয়।

২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানে অর্থায়ন কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, অর্থের সংকট তৈরি হলেও রোহিঙ্গাদের খাদ্য, পুষ্টি, পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষার প্রয়োজন কমেনি। অর্থায়নে বড় ঘাটতি হলে এর প্রভাব শুধু রোহিঙ্গা শিবিরে নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, ক্যাম্পের স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উদ্দেশে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, মানবিক সহায়তায় দীর্ঘদিনের ক্লান্তি যেন মানবিক দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার কারণ না হয়। একই সঙ্গে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণের ওপর তৈরি হওয়া চাপ মোকাবিলায় তাদের জন্য সহায়তাকেও মানবিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের অবদানের প্রশংসা করে শামা বলেন, শুধু ত্রাণ ও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই খুঁজে বের করতে হবে।

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনকে বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। শামা বলেন, নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়াই রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে টেকসই সমাধান। কোনো শরণার্থী শিবির কখনোই নিজস্ব মাতৃভূমির স্থায়ী বিকল্প হতে পারে না।

দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পর রাখাইন থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের বিষয়ও যাচাইয়ের আওতায় আনার কথা বলেন তিনি। তার মতে, নির্ভুল তথ্য ও বিশ্বাসযোগ্য যাচাই প্রক্রিয়া বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের পাশাপাশি জাতিসংঘ, আঞ্চলিক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে যাবে বলেও জানান শামা। চীনের ভূমিকার বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দেশটির নেতৃত্বের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তব উদ্যোগে প্রতিফলিত হওয়ার আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগি শুধু সহানুভূতি বা সংহতির বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর সঙ্গে প্রয়োজন পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় অর্থায়ন, ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতা, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, জবাবদিহি এবং শেষ পর্যন্ত স্থায়ী সমাধান।

শামা বলেন, প্রায় এক দশক আগে রোহিঙ্গা সংকট মানবিক জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে শুরু হলেও এখন এটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকারও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।

রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপরও জোর দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, তথ্য-প্রমাণ ও বাস্তবভিত্তিক সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে বিশ্বজনমত গঠনে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সংলাপে ডিক্যাব সভাপতি একেএম মঈনউদ্দীন, অক্সফাম ইন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন কান্ট্রি ডিরেক্টর অনিল পান্ত, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, পররাষ্ট্র সচিব রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, চীনের ডেপুটি চিফ অব মিশন লিউ ইউইন, আইওএম বাংলাদেশের চিফ অব মিশন ড. লরা টম-বন্ডে, অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ, কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মুর্শেদ চৌধুরী এবং ডিক্যাবের সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েসসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা সংকটের এক দশক, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি, মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের ঝুঁকি ও সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন, বই প্রকাশ এবং বিভিন্ন বিষয়ে কারিগরি প্যানেল আলোচনাও অনুষ্ঠিত হয়।

মন্তব্য করুন