এক বছরের মধ্যে মামলা জটে অগ্রগতি চায় সরকার: আইনমন্ত্রী
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম
ছবিঃ বাসস
বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘদিনের মামলা জট কমানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, বিচারকদের দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি ও আদালতের কার্যক্রম ডিজিটাল করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, বিচারকরা নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করলে এক বছরের মধ্যেই মামলা নিষ্পত্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব হবে।
বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের (সিএমএম) সম্মেলনকক্ষে দুটি ই-পারিবারিক আপিল আদালতের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় করতে চায় সরকার। আদালতে গিয়ে যেন মানুষ দীর্ঘদিন হয়রানির শিকার না হয় এবং যথাসময়ে ন্যায়বিচার পায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
আইনমন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে ৪৬ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন। বিপুলসংখ্যক এসব মামলা নিষ্পত্তির দায়িত্বে রয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৩০০ বিচারক। ফলে বিচারকদের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হচ্ছে, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে এই চাপ বেশি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যেসব এলাকায় মামলার চাপ বেশি, সেখানে দ্রুত বিচার কার্যক্রম পরিচালনায় দক্ষ ও সক্রিয় বিচারকদের পদায়নের বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার।
আদালতের কার্যক্রম পরিচালনায় সময়ানুবর্তিতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, কোনো কোনো আদালতে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিচারিক কার্যক্রম শেষ করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিচারকদের নির্ধারিত সময় যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। দায়িত্ব পালনে অনীহা বা গাফিলতির সুযোগ নেই বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
বিচারব্যবস্থার সামনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। তার মতে, এআই ব্যবহার করে মানুষের কণ্ঠস্বর নকল, পরিচয় অনুকরণ এবং ভুয়া তথ্য তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় সাক্ষ্য, জবানবন্দি ও রায় প্রণয়নের ক্ষেত্রে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিচারকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি ডিজিটাল প্রমাণ যাচাইয়ে আরও সতর্ক হতে হবে।
আদালতের কার্যক্রম আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে কারাগার থেকে আসামিদের আদালতে আনা-নেওয়ার প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। বর্তমানে আসামিদের হাজির করতে পরিবহন, নিরাপত্তা ও জনবলের প্রয়োজন হয়। এ প্রক্রিয়া সহজ করতে কারাগারে থেকেই ডিজিটাল পদ্ধতিতে হাজিরা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ইতোমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলকভাবে এ ব্যবস্থা চালু হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি আরো বলেন, ই-বেইলবন্ড চালুর ফলে মানুষ ইতোমধ্যে সুফল পেতে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে ই-জুডিশিয়ারি কার্যক্রম বিস্তৃত করে বিচারিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ ডিজিটাল করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি হ্রাস করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সাথেও আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মামলার চাপ কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা মধ্যস্থতা কার্যক্রমের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। আইনমন্ত্রী জানান, জাইকা, জার্মানির উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জিআইজেড এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহযোগিতায় মামলা দায়েরের আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের ৩০টি জেলায় এ কার্যক্রম চলছে এবং সাফল্যের হার ৬২ শতাংশের বেশি। ১১টি আইনের আওতায় মামলা দায়েরের আগে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতে আদালতে নতুন মামলা আসার প্রবণতা কমবে বলে আশা করছে সরকার।
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন ও গুম-সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের সময় বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেয়া হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা আইনের সংশোধন নিয়েও জনপরামর্শ গ্রহণ করা হচ্ছে। জনগণের বাকস্বাধীনতা ও অধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে আইন প্রণয়নের জন্য সরকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, ভুক্তভোগী পরিবার, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা হয়েছে। সাংবাদিকদের মতামতও নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য বিবেচনায় নিয়ে সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও যৌক্তিক সংশোধনের পথে এগোতে চায় সরকার।
বিচারব্যবস্থার উন্নয়নে আইন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গঠনমূলক পরামর্শ গ্রহণের আশ্বাস দিয়ে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আদালতের কোনো অনিয়ম বা উন্নয়নের সুযোগ চোখে পড়লে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। বিচারকদের পাশাপাশি সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ আদালতের মাধ্যমে দ্রুত ও ন্যায়সংগত প্রতিকার পাওয়ার বিষয়ে আস্থা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে আইন সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ মো. রফিকুল ইসলাম এবং ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)