Logo
×

Follow Us

আইন-আদালত

দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে ইনুর আপিল

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৭ এএম

দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে ইনুর আপিল

সংগৃহীত ছবি

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু। তিনটি অভিযোগে তাঁকে ১০ বছর করে মোট ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ আপিলের বিষয়টি জানিয়েছেন। এর আগে গত ৫ অক্টোবর প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম জানান, ইনুর সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছে প্রসিকিউশন।

গত ৩০ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়টি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এতে তিনটি অভিযোগে ইনুকে ১০ বছর করে মোট ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষে আদালতে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। আসামিপক্ষে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মনসুরুল হক চৌধুরী।

মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে উসকানি, নির্দেশনা ও সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি দিয়েছিলেন তিনি। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সরকারের অংশীদার জাসদের সভাপতি হিসেবে নিজের অবস্থান ব্যবহার করে আন্দোলন দমনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের এক সভায় উপস্থিত ছিলেন ইনু। ওই সভায় কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন এবং সান্ধ্য আইন জারিসহ কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেওয়া ও তা কার্যকর করার ঘটনায় ইনুর নির্দেশনা, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০ জুলাই দুপুরে ইনু নিজ জেলা কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরি এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। ওই নির্দেশনার পর কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। এতে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। এ ঘটনায় রাইসুল হকসহ আরো অনেকে আহত হন এবং কয়েকজনকে আটক করে নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, আন্দোলনকারীদের ঘেরাও, হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানো এবং আটক ও নির্যাতনের পরিকল্পনা নিয়ে ইনু শেখ হাসিনার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। ২০ জুলাই আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্তে তিনি সম্মতি দেন এবং তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সভায় আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যা দিয়ে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করার অভিযোগ রয়েছে ইনুর বিরুদ্ধে। জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব বাস্তবায়নে নির্দেশনা ও সহায়তা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জোটের সশস্ত্র কর্মীদের হাতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়ার অভিযোগও মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ৪ আগস্ট সান্ধ্য আইন বহাল রাখা, আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো এবং তাঁদের ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে দমন করার সিদ্ধান্তে ইনু সমর্থন দেন। শেখ হাসিনার সাথে টেলিফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে ষড়যন্ত্র ও সহায়তা করার পাশাপাশি নিজ দলের নেতাকর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।

মামলায় কুষ্টিয়ায় ছয়জনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির প্রতি সংহতি জানিয়ে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন। সকাল ১০টার দিকে হাসপাতাল মোড়ে জড়ো হওয়া ছাত্র-জনতা চৌড়হাস হয়ে মজমপুরের দিকে শান্তিপূর্ণভাবে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে শহরের বিভিন্ন স্থানে তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এ ঘটনায় দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মো. মাহবুবউল আলম হানিফ, ইনু, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক মো. আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান আতার নির্দেশনা ও পরিকল্পনার প্রসঙ্গও অভিযোগে এসেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী পুলিশের ছত্রচ্ছায়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আন্দোলন দমনে উসকানির অভিযোগের পক্ষে ইনুর বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে তিনি আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একইভাবে ২৭ জুলাই একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে উল্লেখ করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা এবং সান্ধ্য আইন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করার অভিযোগও আনা হয়েছে।

এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ডের বিরুদ্ধে ইনুর খালাস চেয়ে করা আপিল এবং তাঁর সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে প্রসিকিউশনের করা আপিল—দুটিই সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন প্রক্রিয়ার অংশ।

মন্তব্য করুন