Logo
×

Follow Us

আইন-আদালত

নুসরাত হত্যা মামলার রায়ে হাইকোর্টের কঠোর সমালোচনা

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৮ এএম

নুসরাত হত্যা মামলার রায়ে হাইকোর্টের কঠোর সমালোচনা

ফাইল ছবি

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় কঠোর মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে মাত্র দুজনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া গেছে। ভুল মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে এমন সাজা দেওয়া সভ্য সমাজে প্রত্যাশিত নয়।

নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১১২ পৃষ্ঠার রায়টি প্রকাশ করা হয়। এর আগে গত ২৪ আগস্ট বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন।

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, দণ্ডপ্রাপ্ত মোহাম্মদ শামীম, রুহুল আমিন, মাকসুদ আলম কাউন্সিলর ও আফসারউদ্দিনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো ন্যূনতম প্রমাণও পাওয়া যায়নি। অথচ তারা সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্জন কনডেম সেলে বন্দিজীবন কাটিয়েছেন। আদালত মনে করেন, এ ধরনের অবিবেচনাপ্রসূত সাজা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবারের ওপরও বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলেছে।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে মাত্র দুজনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া গেছে। ভুল মূল্যায়নের ভিত্তিতে দেওয়া এমন রায়কে অবিবেচনাপ্রসূত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন সাজা হিসেবে অভিহিত করে হাইকোর্ট বলেন, সভ্য সমাজে এ ধরনের দণ্ড প্রত্যাশিত নয়।

নিম্ন আদালতের বিচারকের ভূমিকা নিয়েও কঠোর পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালতের মতে, সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারকের মধ্যে বিচারিক সংবেদনশীলতার ঘাটতি ছিল। ফৌজদারি মামলা ও সাজা দেয়ার মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন না করা পর্যন্ত তাকে সেশনস এখতিয়ার থেকে সরিয়ে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ জন্য আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, নিম্ন আদালতের বিচারক মামুনুর রশীদের দেয়া রায় সম্পর্কে হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এক হত্যাকাণ্ডে ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া বিচারিক দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় বিচারবোধের ঘাটতির বিষয়টি সামনে এনেছে।

হাইকোর্টের রায়ে নুসরাত হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। তারা হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম।

চার আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের এবং উম্মে সুলতানা ওরফে পপি।

অন্যদিকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া কিংবা মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার মতো যথেষ্ট কারণ না থাকায় ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। তারা হলেন কামরুন নাহার মনি, হাফেজ আব্দুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, আব্দুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা, রুহুল আমিন, আবছার উদ্দিন এবং মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে নুসরাতকে যৌন হয়রানির অভিযোগে মামলা করেন তার মা শিরীন আখতার। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হলে তার অনুসারীরা তাকে কারাগার থেকে বের করে আনার জন্য বিভিন্নভাবে তৎপরতা চালায়।

পরে ৩ এপ্রিল কারাগারে সিরাজ-উদদৌলার সঙ্গে সাক্ষাতের পর তার অনুসারীরা নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করে বলে মামলার অভিযোগে উঠে আসে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে নুসরাতকে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়।

গুরুতর দগ্ধ নুসরাতকে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। পরে ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল হয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান তিনি।

নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল এ ঘটনায় মামলা করেন। ২৮ মে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল এবং ২০ জুন অভিযোগ গঠন করা হয়। পরে সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক শেষে একই বছরের ২৪ অক্টোবর রায় ঘোষণা করা হয়। মাত্র ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক গ্রহণের পর ওই রায়ে ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

মন্তব্য করুন