বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, চাপে ম্যাক্রোঁ সরকার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৩ পিএম
সংগৃহীত ছবি
ফ্রান্সজুড়ে চলমান বিক্ষোভ ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে কারফিউ জোরদার এবং জনসমাগমস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছে দেশটির সরকার। সপ্তাহজুড়ে বিভিন্ন ভবনে অগ্নিসংযোগ ও হাজার হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাটের ঘটনার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়েছে। তবে পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলনে শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের উত্থাপিত দাবিগুলোর সমাধান করা প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মপরিবেশের উন্নয়ন এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় থেকে স্বস্তি দেয়ার দাবিতে আন্দোলন করছেন বিক্ষোভকারীরা। অন্যদিকে, সরকারি ঋণের চাপ ও পার্লামেন্টে রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে বাজেট অনুমোদনেও জটিলতার মুখে পড়েছে সরকার।
বিক্ষোভ মোকাবিলায় বাড়তি নিরাপত্তা
আগামী ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভকে সামনে রেখে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ স্বীকার করেন, বিক্ষোভের তীব্রতা যথাযথভাবে অনুমান করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। শনিবারের আন্দোলনের সময় কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিনের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। সহিংসতার সময় মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরের একটি ঐতিহাসিক টাউন হলও আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়।
রাজধানী প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক ও লে আল শপিং এলাকায় রাতের কারফিউ জারি করা হয়েছে। লিওঁসহ অন্যান্য শহরেও বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সোমবার রাতে প্যারিস ও লিওঁতে বড় ধরনের সহিংসতার খবর না পাওয়া গেলেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করছে প্রশাসন।
রবিবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের আলাদা করে দেখার কথা বলেন। তিনি জানান, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মপরিবেশের দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য শুনবে সরকার। তবে সহিংসতায় জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।
শিক্ষা খাতের সংকট থেকে বৃহত্তর আন্দোলন
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিসের উপকণ্ঠে উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিক্ষোভের সূচনা হয়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত চাপ, জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকসংকটের সমাধানের দাবিতে তারা রাস্তায় নামেন। পরে বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মীরা এতে যোগ দেন। একপর্যায়ে শিক্ষা খাতের দাবিকে ছাড়িয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি পরিষেবার অবনতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নেয় আন্দোলনটি।
বিক্ষোভকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কিছু উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। গত ৮ অক্টোবর দেশটির জাতীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় সবচেয়ে বেশি শিক্ষকসংকটে থাকা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে তিন হাজারের বেশি বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। পাশাপাশি আরো কয়েক শ শিক্ষক নিয়োগের অনুমোদন দেয়া হয়।
তবে আর্থিক সংকট ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে বড় পরিসরে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। ফ্রান্সের জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত জুনের শেষে দেশটির সরকারি ঋণ বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি ইউরোতে দাঁড়ায়, যা বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১১৯ শতাংশের সমান।
সরকারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ২০২৭ সালে তা কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আগামী বছর শুধু ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় ১২ বিলিয়ন ইউরো বেড়ে ৯১ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ জনসেবামূলক খাতে ব্যয়ের সুযোগ আরও সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই ম্যাক্রোঁর
আর্থিক সংকটের পাশাপাশি পার্লামেন্টে রাজনৈতিক সমর্থনের ঘাটতিও ম্যাক্রোঁ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সের পার্লামেন্টে প্রেসিডেন্টের মিত্রদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় বাজেট অনুমোদন নিয়ে বারবার জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
চলতি বছরের বাজেট অনুমোদন করতেও সরকারকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ভোট ছাড়াই বিশেষ সাংবিধানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে বাজেট কার্যকর করার উদ্যোগ নেয় সরকার। এ সিদ্ধান্তের জেরে মন্ত্রিসভাকে অনাস্থা প্রস্তাবের মুখেও পড়তে হয়। তবে দুটি অনাস্থা প্রস্তাবই টিকে যায়।
রাজপথের আন্দোলন, সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ এবং পার্লামেন্টে রাজনৈতিক বিভক্তি—সব মিলিয়ে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে ম্যাক্রোঁ সরকার। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিক্ষা ও জনসেবার সংকট মোকাবিলা এবং বাজেট ঘাটতি কমানোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)