মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় সর্বোচ্চে জ্বালানি তেলের দাম
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৬ এএম
সংগৃহীত ছবি
হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১১ দশমিক ২৭ ডলারে পৌঁছায়, যা গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ২ শতাংশ বেড়ে ১০০ দশমিক ৬০ ডলারে ওঠে। পরে অবশ্য ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের দাম কমে যথাক্রমে ১০৯ দশমিক ২৭ ও ৯৮ দশমিক ৪৬ ডলারে নেমে আসে।
চলতি বছরের মে মাসে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারের ওপরে উঠেছিল। তবে জুনের শেষ দিকে তা কমে ৭৩ ডলারে নেমে আসে। এপ্রিলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামও কমতে শুরু করে। কিন্তু জুলাই থেকে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা আবার বাড়তে থাকায় সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পারস্য উপসাগর থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় বাজারে অস্থিরতা আরো বাড়তে পারে। দীর্ঘ সময় তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচেও।
এদিকে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান সংঘাত তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। হুতিদের হামলা অবকাঠামোগত স্থাপনার বাইরে সৌদি আরবের শাইবাহ তেলক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এতে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় তেল উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রাখার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সৌদি আরবের উৎপাদন ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে আরও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
বিশ্ববাজারের তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, তেলবাহী ট্যাংকারে ধারাবাহিক হামলার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি প্রায় যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে এসেছে। কিন্তু নতুন করে হামলা শুরু হওয়ায় সরবরাহ আবারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১৮টি ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
কেপলারের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহের শুরুতে পারস্য উপসাগর থেকে দৈনিক গড়ে তেল সরবরাহ কমে ৮৫ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। অথচ দুই সপ্তাহ আগেও এই সরবরাহের পরিমাণ ছিল দৈনিক দুই কোটি ব্যারেলের বেশি। সরবরাহে এই বড় ধরনের পতন বাজারে দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি করছে।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএনজির বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে তেলের দামের সাথে ঝুঁকিজনিত অতিরিক্ত মূল্য যুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে তেল পরিবহনে ট্যাংকারের ভাড়া রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকিও বেড়েছে। বিশ্লেষক ওয়ারেন প্যাটারসন ও ইওয়া মান্থের মতে, তেল সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত মূল্য ধীরে ধীরে কমে আসত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে তেল পরিবহনের ব্যয় কমাতে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কিছু ট্যাংকার বিক্রির অনুমতি দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার তেল পরিবহনে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ব্যবহৃত জাহাজগুলো ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নামে পরিচিত। এসব ট্যাংকার সাধারণত পশ্চিমা শিপিং ও বীমাব্যবস্থার বাইরে থেকে তেল পরিবহন করে।
যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কিছু ট্যাংকার বিক্রির অনুমতি দিলে সেগুলো বৈধ বাজারে ফিরে আসার সুযোগ পেতে পারে। এতে তেল পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যয় কমতে পারে। তবে এ উদ্যোগে পরিবহন সক্ষমতা কতটা বাড়বে এবং তা কত দ্রুত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমাতে ভূমিকা রাখবে, তা এখনো স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)