Logo
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

আরামকোর স্থাপনায় হুথিদের হামলা, বাড়ছে সৌদি-ইয়েমেন সংঘাত

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৪ পিএম

আরামকোর স্থাপনায় হুথিদের হামলা, বাড়ছে সৌদি-ইয়েমেন সংঘাত

ছবিঃ আল জাজিরা

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবনে হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী। মঙ্গলবার দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাহরানে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় একটি তেল স্থাপনায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলা চালানোর খবর আসে। পাল্টাপাল্টি হামলায় সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সংঘাত আরো তীব্র হয়ে উঠেছে।

সৌদি সরকারি বার্তা সংস্থা এসপিএকে দেওয়া এক বিবৃতিতে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, আরামকোর প্রশাসনিক ভবনে হামলার পর আগুনের সূত্রপাত হলেও দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এ ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

এর আগে মঙ্গলবার হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে উল্লেখ করে সেগুলোর আশপাশ থেকে কর্মী ও বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। সানার আল-সাবাহ এলাকায় ইয়েমেনি অয়েল কোম্পানির কেন্দ্রীয় তেল স্থাপনা থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের নির্দেশের পর হুথিদের পক্ষ থেকে এ হুঁশিয়ারি আসে।

হুথি মুখপাত্র সতর্ক করে বলেন, সানায় যেকোনো ধরনের বিমান হামলা চালানো হলে সৌদি রাজধানী রিয়াদে কঠোর ও বেদনাদায়ক জবাব দেয়া হবে। এর পরপরই দাহরানে আরামকোর স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে।

এদিকে সৌদি আরবের দিকে ছোড়া বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝআকাশে প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এসপিএর প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিহত করা দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে চারজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ১৫টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

সানায় তেল স্থাপনায় বিমান হামলা

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সরিয়ে নেয়ার নির্দেশের পর ইয়েমেনের রাজধানী সানায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। হুথি-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের দাবি, সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিমান হামলায় আল-সাবাহ এলাকার একটি তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইয়েমেনি অয়েল কোম্পানি জানিয়েছে, হামলার আগেই তাদের মজুতাগারগুলো খালি করা হয়েছিল। ফলে জ্বালানি সরবরাহ বা মজুতের ওপর এ হামলার তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়বে না বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে জ্বালানির ঘাটতির আশঙ্কায় সানার পেট্রল পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের রাস ঈসা বন্দরে হামলা চালিয়ে তেলের ট্যাংক ধ্বংস করেছে। এ ছাড়া হুথি নিয়ন্ত্রিত হোদাইদাহ প্রদেশের একটি তেল স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সৌদি জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি অভিযোগ করেছেন, হুথিরা এসব স্থাপনা এবং ভূগর্ভস্থ জ্বালানি ডিপো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করছিল। অন্যদিকে, হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সানায় হামলা অব্যাহত থাকলে আগে থেকে সতর্ক করা এলাকাগুলোতে পাল্টা হামলা চালানো হবে।

রিয়াদে নিরাপত্তা জোরদার, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের দাবি

সৌদি কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার দাহরানের আরামকো সদর দপ্তর, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রাজধানীতে অবস্থিত আরামকোর একটি তেল শোধনাগার এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে রিয়াদের উত্তরাঞ্চলে আরও তিনটি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে সৌদি জোট।

এর আগে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ও হতাহতের খবর পাওয়া যায়। এসব ঘটনার পর সৌদি আরব ও আশপাশের দেশগুলোতে বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম, এয়ার ইন্ডিয়া, ইতিহাদ, লুফথানসা, ডেল্টা, গালফ এয়ার ও কাতার এয়ারওয়েজসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ওই অঞ্চলে ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে। হামলার জন্য গোষ্ঠীটিকে চড়া মূল্য দিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে এসপিএ।

ইয়েমেনে পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে সৌদি আরব। দেশটিতে হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি বাহিনী ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামে সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযানে বিমান সহায়তা দিচ্ছে।

ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীর দাবি, মঙ্গলবার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তায়েজ গভর্নরেটে হুথিদের অবস্থান ও সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে নয়টি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ডুবাব জেলায় পাঁচটি এবং আল-মাসরাখ জেলায় চারটি হামলার ঘটনা ঘটে। একই অঞ্চলের আল-শাগাব এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথি যোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে বলেও জানিয়েছে ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যম কেন্দ্র।

এদিকে মানবাধিকার সংগঠন ইয়েমেনি নেটওয়ার্ক ফর রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমের অভিযোগ, গত ২৪ ঘণ্টায় তায়েজে হুথিদের গোলাবর্ষণে পাঁচ বছরের এক শিশুসহ অন্তত পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১৭ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত সাতটি বাড়িঘর। ওই সময়ে তায়েজজুড়ে ১৮০টির বেশি গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি।

হুথিদের অগ্রযাত্রা ও মানবিক সংকট

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে মোখা বন্দরনগরীর দিকে আকস্মিক স্থল অভিযান চালিয়ে সরকারি বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে হুথিরা। একই মাসে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার দাবিও করে গোষ্ঠীটি। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রণালির মায়্যুন দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইয়েমেনে সংঘাতের বিস্তার ও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি)। সংস্থাটির সভাপতি মিরজানা স্পোলজারিক সব পক্ষকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইয়েমেনের এডেন ও সানাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি ও ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং মানুষের প্রাণহানি পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলছে।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, আগস্ট থেকে ইয়েমেনে অন্তত ৪৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। হতাহতদের উল্লেখযোগ্য অংশ শিশু। এ ছাড়া সেপ্টেম্বর থেকে দেশটিতে দুই লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত এবং ইয়েমেনে পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযানের ঘটনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে এর প্রভাব আরো বাড়তে পারে।

মন্তব্য করুন