বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয়েও হুথিদের হামলা ঠেকাতে হিমশিম সৌদি আরব
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩০ এএম
সংগৃহীত ছবি
প্রতিরক্ষা খাতে বছরে বিপুল অর্থ ব্যয় এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুত থাকা সত্ত্বেও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে সৌদি আরব। দেশটির বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার ও পাইপলাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্রমাগত হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রতিরক্ষা খাতে সৌদি আরবের ব্যয় ছিল ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। সামরিক ব্যয়ে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় রয়েছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ও থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন অস্ত্র সৌদির সামরিক বহরে রয়েছে। কিন্তু দেশটির বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সৌদি আরবের নিরাপত্তাঝুঁকি একাধিক দিক থেকে তৈরি হচ্ছে। পূর্ব দিক থেকে ইরানি বাহিনী এ বছর সংঘাতের তীব্র সময়ে সৌদি লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। উত্তরে ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়ারা গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন লক্ষ্য করে ড্রোন পাঠিয়েছে। দক্ষিণে ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকা ও ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপণব্যবস্থা ব্যবহার করে হুথিরা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদির জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু রিয়াদ বা নির্দিষ্ট কোনো তেল শোধনাগার রক্ষা করা নয়; বরং বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে থাকা বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো, পানি শোধনাগার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা। সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য শনাক্ত করা, কোন ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করা জরুরি তা দ্রুত নির্ধারণ করা এবং নাগরিকদের সতর্কবার্তা পাঠাতে হয় অল্প সময়ের মধ্যে। সৌদির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক হামলা আকাশেই ধ্বংস করতে পারলেও সব হামলা ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সীমিত প্রতিরক্ষা সম্পদ কোথায় মোতায়েন করা হবে, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত কৌশল
সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষাকে চাপে ফেলতে হুথিরা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করছে। একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ছুড়ে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার এই কৌশল ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহৃত কৌশলের সাথে তুলনীয়। ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলক কম উচ্চতায় উড়ে আসায় রাডারে সেগুলো শনাক্ত ও অনুসরণ করা কঠিন। হুথিদের দাবি, তাদের নতুন প্রজন্মের কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো একক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সব ধরনের হামলা শতভাগ প্রতিহত করতে সক্ষম নয়।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা আট বছর আগেই ইয়েমেনে ইরানের তৈরি বলে শনাক্ত করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পেয়েছিলেন। দুই বছর আগে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দল জানায়, বিদেশ থেকে হুথিদের কাছে অস্ত্র, প্রযুক্তি ও অর্থ পৌঁছানো এবং যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার যে মাত্রা দেখা গেছে, তা নজিরবিহীন। বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের ব্যবহৃত ‘হাতেম-২’ ও ‘প্যালেস্টাইন-২’ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশার সাথে ইরানি অস্ত্রের মিল রয়েছে। এগুলো দ্রুতগতিতে চলতে এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়।
গত বছর হুথিদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হানে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজেদ আল-নাজিলির ভাষ্য অনুযায়ী, হুথিরা ইরানের কিছু আকাশ প্রতিরক্ষাস্ত্র নিজেদের মতো করে পরিবর্তন করেছে। তার দাবি, এসব ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুর দিকে যাওয়ার পথে আকাশে চক্কর দিতে পারে এবং তাপ অনুসরণকারী প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
ইরানের সাথে সম্পর্ক, নিজস্ব লক্ষ্যও রয়েছে হুথিদের
ইরানের আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হুথিরা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইরাকের ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা সামরিক চাপে থাকলেও হুথিদের সক্ষমতা বেড়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তেহরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে ইরানের সাথে সম্পর্ক থাকলেও হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য ও কৌশলও রয়েছে।
২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সাথে সংঘাতে ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। সংশ্লিষ্ট অবরোধ ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাবও অব্যাহত রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজে হামলার ঘোষণা দেয় হুথিরা। পরে লোহিত সাগর উপকূলের আরামকো শোধনাগার ও সৌদির বিমানঘাঁটিগুলোও তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর প্রতি সৌদির বিমান হামলা বন্ধের পাশাপাশি রিয়াদের কাছ থেকে বিপুল ক্ষতিপূরণ দাবি করছে গোষ্ঠীটি।
সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত সোমবার জানান, দুই পক্ষের আলোচনা শুরু করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে তেহরান প্রস্তুত। তবে হুথিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি বলেছেন, সৌদি আরব মধ্যস্থতার প্রস্তাব গ্রহণ করলেও হুথিদের দেওয়া দুই সপ্তাহ বা এক মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তার হুঁশিয়ারি, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর ব্যাপ্তি ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে এবং ভবিষ্যতে সমঝোতা আরো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সংঘাত বাড়লে সৌদির অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ঝুঁকি
হুথিদের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরব পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার আগের সপ্তাহে দেশটির সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ মোবাইল ফোনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কবার্তা দেওয়া বন্ধ রেখেছিল। তবে রিয়াদের বাসিন্দারা সিএনএনকে জানিয়েছেন, পরে সতর্কবার্তা আবার চালু করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ সোমবার তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথাও জানিয়েছে।
রিয়াদে বসবাসরত এক প্রবাসী সিএনএনকে জানান, নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে চলতি সপ্তাহে তার সন্তানদের অনলাইনে ক্লাস করতে হচ্ছে। বিমানবন্দরে হামলার সময় স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলেও সৌদি কর্তৃপক্ষ সিএনএনকে কোনো বক্তব্য দেয়নি।
হুথিদের হামলার জবাবে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার মধ্যে সৌদি আরবকে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। বিমানবন্দরে প্রাণহানির পর হুথিদের সাথে নমনীয় সমঝোতা রাজনৈতিকভাবে রিয়াদের জন্য কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে, বিমান হামলা জোরদার করলে পাল্টা হামলার ঝুঁকি বাড়বে। এতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবকে গড়ে তোলার যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ঝুঁকি শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ নয়। ডেটা সেন্টার, পানি শোধনাগার ও বিমানবন্দর সৌদির প্রযুক্তি, পানি সরবরাহ এবং পর্যটন খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। চলতি মাসের শেষ দিকে রিয়াদে একটি বড় বিনিয়োগ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে এ আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংঘাতের প্রভাবে চলতি সপ্তাহে রিয়াদে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড পেট্রোলিয়াম কংগ্রেসে অনেক বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সহায়তায় স্থল অভিযান চালিয়ে হুথিদের পরাস্ত করা সহজ হবে না। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিতে অভ্যস্ত এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধে অভিজ্ঞ এই গোষ্ঠী গত এক মাসে সরকারি বাহিনীর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি করেছে। গত বছর হুথিদের বিরুদ্ধে সাত সপ্তাহের বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের এক বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছিল। তবু হুথিদের পুরোপুরি দমন করা যায়নি; বরং তারা কয়েকটি মার্কিন রিপার ড্রোন ভূপাতিত করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় হুথিদের কিছু কমান্ডার নিহত হলেও গোষ্ঠীটির মূল নেতৃত্ব অক্ষত রয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের (আইএসডব্লিউ) তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন তৃতীয় বৃহত্তম শহর ও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকেন্দ্র তাইজ হুথিদের অবরোধের মুখে রয়েছে। অন্যদিকে, হুথিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদারে তৎপর সৌদি আরব। পাকিস্তান দেশটির নিরাপত্তায় কয়েক হাজার সেনা পাঠিয়েছে এবং মিসরও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত বাড়াতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে রিয়াদ।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুতেও চাপ রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেলের এক প্রতিবেদনে ইরানবিরোধী অভিযানের কারণে কৌশলগত অস্ত্রের ঘাটতি এবং পুনরায় সরবরাহের ক্ষেত্রে শিল্পোৎপাদনসংক্রান্ত জটিলতার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনীহা রয়েছে। হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলার সম্ভাবনা নাকচ না করলেও তিনি এ বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) বিশ্লেষক মাইকেল র্যাটনির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান থেকে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে সংকটের সময় সৌদি আরবকে একা ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে, সামরিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা থাকা সত্ত্বেও হুথিদের হামলা ঠেকাতে সৌদি আরবকে কঠিন নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে দেশটির আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)