রিয়াদে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি হুথিদের, রাতভর বিস্ফোরণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২১ এএম
সংগৃহীত ছবি
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে টানা তৃতীয় দিনের মতো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। সোমবার রাতে শহরটিতে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, রিয়াদ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় সৌদি আরবে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে। রাজধানীর বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলোতে আরো হামলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে হুথিরা।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানান, হুথিরা রিয়াদের দিকে একটি এবং খামিস মুশাইতের দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। জোটের দাবি, তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রই আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সোমবার রাতে রিয়াদের বাসিন্দারা একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনেন। এর কিছুক্ষণ আগে তাঁদের মুঠোফোনে সম্ভাব্য আকাশপথের হামলা নিয়ে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল।
ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ দেশটির জনবহুল বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী হুথিরা দাবি করেছে, রিয়াদের বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছিল তাদের হামলার লক্ষ্য। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, ইয়েমেন সীমান্তের কাছে খামিস মুশাইতের একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনা ছাড়া অন্য শহরগুলোর বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা না করতে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ও যাত্রীদের সতর্ক করেছেন তিনি। হুথিদের দাবি, এসব বিমানবন্দর এখন নিরাপদ নয়।
এর আগে শনিবারের হামলায় রিয়াদের বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরদিন রোববারের আরেকটি হামলায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হন। এসব ঘটনার পর বিমানবন্দরটি বন্ধ রাখা হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী শনিবার পর্যন্ত বিমানবন্দরটি বন্ধ থাকবে। এতে বিভিন্ন বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট বাতিল করেছে।
তেল স্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
বিমানবন্দরের পাশাপাশি সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতেও হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান আল সৌদ বলেছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিমানবন্দরে হামলার ঘটনা সৌদি আরবের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রিয়াদে এক জ্বালানি সম্মেলনে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো গুরুতর এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় কঠোর প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরো বলেন, অর্থনীতিকে বহুমুখী করার উদ্যোগ এগিয়ে নিতে হবে এবং বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে।
আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে তদন্ত
ধারাবাহিক হামলার পর সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেন সব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকাতে পারছে না, তা খতিয়ে দেখছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মধ্যপ্রাচ্যের দুই কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, হুথিরা প্রথমে কয়েকটি ড্রোন পাঠিয়ে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলে। এরপর ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুথিদের হাতে এমন কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলোর ওয়ারহেড উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। ফলে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মাধ্যমে সেগুলো প্রতিহত করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো এক হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে রিয়াদে পৌঁছানোর আগে আরো কার্যকর সতর্কবার্তা দেয়া সম্ভব ছিল কি না, তা-ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তাদের একজন।
যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি
হুথিদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এ সংঘাতে ওয়াশিংটন সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো ইঙ্গিত দেননি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, হুথিরা খুব খারাপ আচরণ করছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নিলে পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হুথিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি। বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে জড়ালে দেশটি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে দ্রুত জবাব দেয়া হবে।
সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও এসব স্থাপনা থেকে দূরে থাকার সতর্কবার্তা দিয়েছেন আল-বুখাইতি। তার দাবি, এসব স্থাপনা হুথিদের কাছে বৈধ লক্ষ্যবস্তু।
ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থক বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছে হুথিরা। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোর পাশাপাশি স্থলযুদ্ধে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সহায়তা করছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ায় ইয়েমেনের সংঘাতও আরো তীব্র হয়েছে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)