দিল্লিতে মমতা-কেজরিওয়ালসহ শত শত বিক্ষোভকারী আটক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিতে গিয়ে দিল্লিতে পুলিশের অভিযানে মমতা-কেজরিওয়ালসহ শত শত বিক্ষোভকারী আটক হয়েছেন।
শনিবার (১০ অক্টোবর) আটক হওয়া নেতাদের মধ্যে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এবং ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। এছাড়াও আটক হয়েছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেও।
এদিকে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ ঠেকাতে রাজধানী দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকায় মুঠোফোনের ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া কয়েক ডজন মেট্রো স্টেশন ও বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ‘ককরোচ’ আন্দোলনের উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশ ঠেকাতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ডাক দেয়া হয়েছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের এ প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অসম সুবিধা পাচ্ছে।
আয়োজকদের পরিকল্পনা ছিল, দিল্লির কেন্দ্রীয় অংশে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরে কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হবেন। তবে বিক্ষোভ শুরুর আগেই নিরাপত্তা বাহিনী এলাকাটি ঘিরে ফেলে। এরপরও শহরের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বিক্ষোভ হয়। এর মধ্যে একটি জনপ্রিয় হস্তশিল্পের বাজার ও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধ এলাকাও ছিল। এসব স্থানে বিক্ষোভকারীরা নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক জানান, দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় তরুণ বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ স্লোগান দেন। এ সময় পুলিশ তাদের ধাওয়া করে এবং অনেককে টেনেহিঁচড়ে বাসে তুলে নিয়ে যায়। তাদের সরিয়ে নেয়ার পরও নতুন করে বিক্ষোভকারীরা সেখানে জড়ো হচ্ছিলেন।
পুলিশের সাথে যাওয়ার সময় যোগেন্দ্র সোলাঙ্কি রয়টার্সকে বলেন, ‘এটি জনগণের অধিকার লঙ্ঘন। দেশ আর এটি সহ্য করবে না।’
‘ককরোচ জনতা পার্টি’র এক বিবৃতিতে বলা হয়, মুম্বাই থেকে দিল্লিগামী একটি উড়োজাহাজ অবতরণের পর পুলিশ সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং জ্যেষ্ঠ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে আটক করেছে।
টেলিভিশনে প্রচারিত দৃশ্যে দেখা যায়, উড়োজাহাজের ভেতরে দীপকে তার কাছে আসা পুলিশ কর্মকর্তাদের চ্যালেঞ্জ করছেন। তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি গ্রেপ্তার হতে এসেছি, আমাকে গ্রেপ্তার করুন। আপনাদের ভয় পাই না।’ জবাবে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘না, এটি গ্রেপ্তার নয়। অনুগ্রহ করে সহযোগিতা করুন।’
নেতাদের আটকের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে ‘ককরোচ’ আন্দোলন। সংগঠনটি এ ঘটনাকে ‘কর্তৃত্ববাদী আটক’ হিসেবে উল্লেখ করে তাদের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেছে। একইসঙ্গে নেতাদের আটক করা হলেও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে তারা।
টেলিভিশন চ্যানেলের প্রচারিত দৃশ্য অনুযায়ী, বিরোধীদলের কয়েকজন আইনপ্রণেতার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকেও আটক করা হয়েছে।
বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের সময় দুটি ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের চার সাংবাদিককে পুলিশ অল্প সময়ের জন্য আটক করেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। রয়টার্সের এক সাংবাদিককেও সাময়িকভাবে আটক করা হয়। পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।
সুপ্রিম কোর্টের বাইরে বিক্ষোভরত কয়েকজন আইনজীবীকেও আটক করা হয়। পরে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আদালতের আইনজীবী সমিতির সভাপতি। তবে আটকের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রায় দুই কোটি মানুষের এই বিস্তীর্ণ রাজধানীর প্রধান সড়ক ও প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে। পুলিশ বিভিন্ন বাসে উঠে বিক্ষোভকারীদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে। যানবাহনও পরীক্ষা করা হচ্ছে। সড়কে ব্যারিকেড ও কংক্রিটের প্রতিবন্ধক বসিয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের সরঞ্জামযুক্ত দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যানও মোতায়েন করা হয়েছে।
ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চলমান বিক্ষোভ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা যথাযথভাবে সংশোধন করা হয়নি।
গত সপ্তাহে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে বিক্ষোভ আরো জোরালো হয়েছে।
এ বিষয়ে জ্ঞানেশ কুমার কোনো মন্তব্য করেননি। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিজেপির দাবি, নির্বাচনে তাদের সাফল্য নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন। নির্বাচনে জয়ী হতে ব্যর্থ হয়ে বিরোধীদলগুলো ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে দলটি।
তা সত্ত্বেও প্রায় প্রতিদিনের বিক্ষোভ মোদি সরকারের জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে। কয়েক মাস আগেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে হয়েছিল দেশটির শিক্ষামন্ত্রীকে। এর মধ্যে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
শনিবারের বিধিনিষেধের সমালোচনা করে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা কে সি বেণুগোপাল বলেন, মোদি সরকার ‘আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে’। অন্যদিকে বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্রের দাবি, জনতার বিশৃঙ্খলার ওপর গণতন্ত্রের জয় হয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেয়ার কারণে সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনের ফল প্রভাবিত হয়েছে। এসব নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হয়েছে। এ ঘটনায় বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে দাবি বিরোধীদের।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকা যাচাইয়ের সময় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অন্যত্র চলে গেছেন, ৩ কোটি মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের দাবি, খসড়া ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় চিহ্নিত নামগুলোই বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে যোগ্য কোনো ভোটারের নাম ভুলবশত বাদ পড়লে তিনি পুনরায় ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করতে পারবেন।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)