চীনের নতুন প্রতিরক্ষা আইনের প্রভাব পড়বে প্রায় সকল খাতে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৩ পিএম
সংগৃহীত ছবি
চীনের সংশোধিত জাতীয় প্রতিরক্ষা মোবিলাইজেশন আইন দেশটির অর্থনীতি ও বেসরকারি খাতের বিস্তৃত অংশে প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন বিধান অনুযায়ী, শুধু যুদ্ধ বা ভূখণ্ডের ওপর হামলার পরিস্থিতিতেই নয়, দেশের ‘উন্নয়নস্বার্থ’ হুমকির মুখে পড়লেও বেসামরিক সম্পদ সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এতে পরিবহন, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, খাদ্য সরবরাহ ও শিল্প খাত প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির আওতায় আসতে পারে।
গত ১ অক্টোবর কার্যকর হওয়া সংশোধনীটি ২০১০ সালে আইনটি প্রণয়নের পর প্রথম বড় পরিবর্তন। প্রতিরক্ষা মোবিলাইজেশন বলতে জরুরি পরিস্থিতিতে সামরিক প্রয়োজনে দেশের জনবল, সম্পদ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে প্রস্তুত ও সংগঠিত করার প্রক্রিয়াকে বোঝায়।
দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত আকাংশ খান্ডেলওয়ালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আগের আইনটি মূলত তাইওয়ানকেন্দ্রিক সামরিক প্রস্তুতির সাথে সম্পর্কিত হিসেবে বিবেচিত হতো। চীনের জাতীয় একীকরণের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য এবং তাইওয়ান স্বাধীনতা ঘোষণা করলে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি আইনটির অন্যতম বিবেচনা ছিল।
তবে সংশোধিত আইনে প্রতিরক্ষা মোবিলাইজেশনের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য, ভূখণ্ডের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি ‘উন্নয়নস্বার্থের’ ওপর হুমকিকেও এর আওতাভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু কোন পরিস্থিতিকে উন্নয়নস্বার্থের জন্য হুমকি হিসেবে গণ্য করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট মানদণ্ড না থাকায় আইনটির প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষক খান্ডেলওয়ালের মতে, এই অস্পষ্টতা সামরিক সংঘাতের বাইরেও বেসরকারি সম্পদ প্রতিরক্ষা কাজে ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে পারে। মালাক্কা প্রণালিতে অবরোধ কিংবা দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধের মতো পরিস্থিতিকে চীন তার উন্নয়নস্বার্থের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, আইনটি নিয়ে অতিরিক্ত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। তার দাবি, সংশোধিত আইন অন্যান্য দেশের অনুরূপ আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ‘উন্নয়নস্বার্থ’ ধারণাটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কর্তৃত্বের বৈধতার সাথেও সম্পর্কিত। খান্ডেলওয়ালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা মোবিলাইজেশনের সংজ্ঞায় এই ধারণা যুক্ত হওয়ায় অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার যুক্তিতে সামরিক প্রস্তুতির পরিধি আরো বিস্তৃত হতে পারে।
সংশোধিত আইনের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রতিরক্ষা মোবিলাইজেশনের সাথে সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের সহায়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিধান রয়েছে। ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উদীয়মান শিল্প খাতে প্রতিরক্ষা মোবিলাইজেশনের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এ ছাড়া কৌশলগত উপকরণের মজুত এবং সামরিক পণ্যের সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা মূল্যায়নের বিধান রাখা হয়েছে। প্রতিরক্ষা মোবিলাইজেশন ঘোষণা করা হলে প্রয়োজন অনুযায়ী বেসামরিক স্থাপনা, সরঞ্জাম, যানবাহন ও জায়গা হুকুমদখল বা অধিগ্রহণ করা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকের মতে, এসব বিধান বেসামরিক গবেষণা ও সামরিক শিল্পের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারে। একই সাথে জরুরি পরিস্থিতিতে অর্থনীতির বড় একটি অংশকে প্রতিরক্ষা সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
সংশোধিত আইনটি ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন খান্ডেলওয়াল। ওষুধের কাঁচামাল, বিরল মৃত্তিকা ও চুম্বক, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, সৌর মডিউল এবং মূলধনি পণ্যের ক্ষেত্রে ভারতের চীননির্ভরতা রয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, অর্থনৈতিক বিরোধের সময়ও আইনটি ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ভারতের ওপর কার্যকর হওয়া চীনের রপ্তানি বিধিনিষেধের বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক।
সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)