Logo
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

হুতিদের হামলার দাবিতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ল তেলের দাম

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৪ পিএম

হুতিদের হামলার দাবিতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ল তেলের দাম

সংগৃহীত ছবি

ইয়েমেনের হুতিদের সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি সৌদি আরামকোর স্থাপনায় হামলার দাবির পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়।

বাজারে তেলের প্রধান সূচক ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বরের ফিউচার বৃহস্পতিবার দিনের একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়। দিন শেষে দাম ১০৬ দশমিক ৫০ ডলারেরও বেশি ছিল। শুক্রবার এশিয়ার বাজারে কিছুটা কমলেও প্রতি ব্যারেল তেল ১০৫ ডলারের ওপরেই লেনদেন হচ্ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে এর আগেই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ ছিল। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোতে হামলার আশঙ্কা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

বৃহস্পতিবার হুতিরা দাবি করে, সৌদি রাজধানী রিয়াদে একটি ‘সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তু’ এবং লোহিত সাগরের উপকূলীয় শহর ইয়ানবুতে সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। হুতিদের নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেন নিউজ এজেন্সির এক বিবৃতিতে বলা হয়, দুই অভিযানেই তারা লক্ষ্য অর্জন করেছে।

তবে হামলায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা সৌদি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, হুতিদের ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকির ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তাইফ ও ইয়ানবুর দিকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।

সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোর কেন্দ্র ইয়ানবু। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে জটিলতা তৈরি হওয়ার পর সৌদি তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবেও বন্দরটির গুরুত্ব বেড়েছে। ফলে ইয়ানবু ও আরামকোর অবকাঠামো ঘিরে যেকোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর উৎপাদন, পরিশোধন বা রপ্তানি অবকাঠামো বড় ধরনের হামলার শিকার হলে সরবরাহ সংকট আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো একাধিক হামলার মুখেও পড়েছে।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ড্রোন হামলার পর সৌদির ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলোকে ইয়ানবু বন্দরের সাথে যুক্ত করা এই পাইপলাইন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ দেয়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এরপর সৌদি আরব পূর্বাঞ্চলীয় উপসাগরীয় বন্দর দিয়ে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করেছে এবং হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে সৌদি তেল পরিবহনের পরিমাণও বাড়িয়েছে।

এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলার সময়ই তেলের দাম নতুন করে বেড়েছে। সাত মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানে সমাধানের পথ খুঁজতে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বৃহস্পতিবার আশা প্রকাশ করেন, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ওয়াশিংটন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে আগে হওয়া সমঝোতার স্মারকে ফিরে আসবে। তবে আগস্টের মাঝামাঝি কোনো শান্তিচুক্তি ছাড়াই ওই সমঝোতা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক উদ্যোগ তেলের দাম বৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমাতে পারে। তবে জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও অবকাঠামো ঝুঁকির মধ্যে থাকলে বাজারে বাড়তি ঝুঁকির প্রিমিয়াম বজায় থাকতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার আল-জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের তুলনায় তেলের দাম এখনও বেশ উঁচু। গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো ঝুঁকির মধ্যে থাকাই এর অন্যতম কারণ। তার মতে, জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে চলা কূটনৈতিক তৎপরতা বাজারে কিছুটা ভারসাম্য আনলেও দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা কমার স্পষ্ট প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী চাপ থাকতে পারে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ তেলবাজার বিশ্লেষক জুন গোহের মতে, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে থাকতে পারে। সংঘাতের স্পষ্ট সমাধান না হওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের মজুদের ঘাটতি আরও বাড়ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

হরমুজ ও বাব আল-মানদেব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথই বর্তমানে আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে রয়েছে। সৌদি আরব বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহারের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেও হুতিদের সর্বশেষ হামলার দাবি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর তাৎক্ষণিক প্রভাবই দেখা গেছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে।

মন্তব্য করুন