যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বড় হামলা চালালো ইরান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএম
সংগৃহীত ছবি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ আরও তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংসের পর পাল্টা জবাব হিসেবে হরমুজ প্রণালীর কাছে ১০টি জাহাজে হামলার দাবি করেছে ইরান। একই সময়ে জর্ডানে মার্কিন সেনাদের ব্যবহৃত একটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথাও জানিয়েছে তেহরান। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব ঘটনাকে যুদ্ধ শুরুর পর সমুদ্রপথে দুই পক্ষের সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর কাছে হামলা চালানো ১০টি জাহাজের মধ্যে দুটি যুক্তরাষ্ট্রের এবং আটটি তেলবাহী জাহাজ। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করে। মার্কিন বাহিনীর ভাষ্য, তাদের একটি যুদ্ধজাহাজে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাব হিসেবে এসব জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ওই ঘটনায় কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হননি।
ইরানের হামলায় অন্তত একজন নাবিক নিহত এবং আরেকজন নিখোঁজ হয়েছেন। দুবাই উপকূলে নোঙর করা তেলবাহী জাহাজ ‘হারকিউলিস স্টার’-এ হামলার পর এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে ইরাকের জলসীমায় প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল বহনকারী ‘নিউ অ্যান্ড্রোস’ নামের একটি জাহাজ ড্রোন হামলার পর আগুন ধরে যায়। জাহাজটির ২২ নাবিক নিরাপদে আছেন বলে ইরাকি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
হরমুজ প্রণালীর দুই পাশে উত্তর উপসাগর ও ওমান উপসাগরেও কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান বন্দরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী একটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যও এসেছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জর্ডানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশটিতে মার্কিন সেনাদের ব্যবহৃত একটি ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। জর্ডানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি, এর মধ্যে ১৮টি আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে এবং বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের সব সেনা নিরাপদে রয়েছেন।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী সতর্ক করে বলেছে, ভবিষ্যতে তাদের ওপর আরও হামলা হলে জবাব আরও কঠোর হবে। একই সাথে সমুদ্রে নতুন ও বড় একটি নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষণার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে তারা। ওই এলাকা পাকিস্তানের কাছাকাছি চাবাহার উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে বলে ইরানি বাহিনীর পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
হামলার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। বুধবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। বৃহস্পতিবারও ব্রেন্ট ১০২ ডলারের ওপরে ছিল। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করত। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এই পথে জ্বালানি পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের হিসাবে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। ৩০ আগস্ট যুদ্ধ ফের তীব্র হওয়ার আগে এই পথে প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছিল। ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারে আরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সাথে সৌদি আরবের সংঘাতও নতুন করে বেড়েছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হুতিদের হামলার পর দেশটির তেল স্থাপনাগুলোতে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে। ফলে হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও নৌপথের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইরান নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেছেন, নির্বাচন শেষ হওয়ার পর যুদ্ধ শেষ হতে পারে। তবে ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক প্রতিবেদনে মার্কিন প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ উপদেষ্টার ভিন্ন আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে—তাদের মতে, সংঘাত ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ পর্যন্তও চলতে পারে। এই প্রতিবেদনটি তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)