Logo
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

নেপালে 'ফ্লাশ ফ্লাড-ভূমিধস' নিহত ১,৩৪২, জাতীয় শোক পালন

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৯ পিএম

নেপালে 'ফ্লাশ ফ্লাড-ভূমিধস' নিহত ১,৩৪২, জাতীয় শোক পালন

ছবিঃ আল জাজিরা

ভয়াবহ ভোটেকোশি-ত্রিশূলী বন্যায় প্রাণহানির ঘটনায় সোমবার জাতীয় শোক পালন করছে নেপাল। সর্বশেষ পুলিশি হিসাবে এ দুর্যোগে ১ হাজার ৩৪২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজার ৯৯২ জন। তবে নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্যে এখনও পার্থক্য রয়েছে।

গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও ধসের ১৩তম দিনে জাতীয় শোক পালন করছে নেপাল। সরকারের ৩ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সোমবার দেশটির সরকারি দপ্তর এবং বিদেশে থাকা নেপালি কূটনৈতিক মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা সমন্বয়ের কাজও অব্যাহত রয়েছে।

নেপাল পুলিশ সোমবার জানিয়েছে, ৩ হাজার ৯৯২ জন এখনো নিখোঁজ। এর একদিন আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্যে প্রায় ৫ হাজার নিখোঁজের কথা বলা হয়েছিল। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ, একই ব্যক্তির নামে থাকা একাধিক নিখোঁজের তথ্য বাদ দেওয়া এবং নতুন তথ্য যুক্ত হওয়ায় সংখ্যায় পরিবর্তন আসছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

উদ্ধার তৎপরতার বড় অংশ এখন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সুড়ঙ্গকেন্দ্রিক। নেপালের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল আপার ত্রিশূলী-১, আপার ত্রিশূলী-৩এ, আপার ত্রিশূলী-৩বি, চিলিমে, রাসুয়াগাধি ও লাংটাংসহ বিভিন্ন প্রকল্পে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তাও বাড়ছে। মালয়েশিয়ার ১১ সদস্যের একটি বিশেষ দুর্যোগ উদ্ধারকারী দল নয়টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন নিয়ে নেপালে পৌঁছেছে। বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া ড্রোন, উদ্ধার সরঞ্জাম ও ভারী যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে কাজে লাগানো হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষের ধারণা, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সুড়ঙ্গে এখনো প্রায় ৯০০ কর্মী নিখোঁজ বা আটকা পড়ে থাকতে পারেন। কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপে পূর্ণ দীর্ঘ সুড়ঙ্গে প্রবেশ করে অভিযান চালানো উদ্ধারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও একাধিক জীবিত উদ্ধারের ঘটনায় কিছুটা আশার আলো দেখা দিয়েছে। চীনা নাগরিক লু হাইতাওকে আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গের প্রায় ২২৫ মিটার ভেতর থেকে ১০ দিন পর জীবিত উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের সময় তার শরীরে বড় ধরনের দৃশ্যমান আঘাত ছিল না, তবে সামান্য হাইপোথার্মিয়ার লক্ষণ দেখা যায়।

এর আগের দিন আপার ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গ থেকে দুই নেপালি শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে কয়েক দিনের ব্যবধানে সুড়ঙ্গ থেকে অন্তত তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন উদ্ধারকারীরা।

এদিকে নুয়াকোটের বেত্রাবতীতে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া চারতলা একটি ভবন থেকে ৬৪ বছর বয়সী চান্দিকা কুমারী শ্রেষ্ঠাকেও জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। পরিবার তাকে মৃত মনে করে শোকের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছিল। পরে উদ্ধারকারীরা তার ডাক শুনতে পেয়ে প্রায় ৪৫ মিনিটের অভিযান চালিয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে থাকা রাসুয়ায় এখনো বহু মানুষের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। জেলা প্রশাসনের রোববারের হিসাবে সেখানে ৩ হাজার ৭১ জনের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। নিখোঁজদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা, নিরাপত্তাকর্মী ও বিদেশি পর্যটকরাও রয়েছেন।

উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি দুর্গত এলাকায় মানবিক সংকটও তীব্র হচ্ছে। রাসুয়ার আমাছোদিংমো গ্রামীণ পৌরসভা সড়ক, ঝুলন্ত সেতু ও অন্যান্য যোগাযোগ অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক এলাকায় চাল, ডাল, লবণ ও রান্নার তেলের মজুত ফুরিয়ে আসছে। কিছু দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর কার্যকর মাধ্যম হিসেবে এখন হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বন্যা ও ধসের কারণে নেপালের অবকাঠামোতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৭ হাজার ৫৭০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এতে প্রায় ৩২ হাজার ৯৩৩ মানুষ প্রভাবিত হয়েছেন। একই সঙ্গে ৫৫ কিলোমিটার সড়ক, ৩৭টি যান চলাচলের উপযোগী সেতু এবং ৬৮টি ঝুলন্ত সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জ্বালানি অবকাঠামোতেও পড়েছে বড় ধরনের প্রভাব। দুর্যোগে ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং দুটি সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৭৮৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রভাবিত হয়েছে বলে সরকারের প্রাথমিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে।

গত ২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ, বরফ ও শিলার বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর প্রবল স্রোতের সঙ্গে পানি, কাদা ও ধ্বংসস্তূপ নদী উপত্যকা দিয়ে নেমে আসে। এতে ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্যোগে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে নেপাল সরকার এখন বিস্তারিত পরবর্তী দুর্যোগ মূল্যায়ন চালাচ্ছে।

মন্তব্য করুন