Logo
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

সিরিকে বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলার পর ইরানের পাল্টা আঘাত

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৭ এএম

সিরিকে বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলার পর ইরানের পাল্টা আঘাত

সিরিক এলাকায় বিয়ের অনুষ্ঠান চলার সময় মার্কিন বিমান হামলা চালানো হয়

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক এলাকায় বিয়ের অনুষ্ঠান চলার সময় মার্কিন বিমান হামলায় হতাহতের খবরের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলার কথা জানিয়েছে তেহরান। এক মাসের মতো সময় তুলনামূলক শান্ত থাকার পর আবারও সরাসরি হামলা-পাল্টা হামলায় জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এতে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ইরানে মার্কিন হামলায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হতাহতের খবর প্রকাশের পর জর্ডান, বাহরাইন ও ইরাকে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ওপর আইআরজিসির হামলার চেষ্টার জবাবে ইরানে অভিযান চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, আইআরজিসির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক সক্ষমতা, মাইন-সংক্রান্ত স্থাপনা ও যোগাযোগব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। মঙ্গলবার শুরু হওয়া অভিযানের একটি ধাপ বুধবার শেষ হয়েছে।

তবে ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন হামলা কেবল সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। আহভাজের আশপাশ, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জিরোফত বিমানবন্দর এলাকা, চাবাহার, বান্দার আব্বাস, আসালুয়েহ ও কেশম দ্বীপ থেকেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানানো হয়েছে।

 বিয়ের অনুষ্ঠানে হতাহতের দাবি

সিরিক এলাকায় একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালে মার্কিন হামলার ঘটনাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় অন্তত চারজন নিহত এবং ৫০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চার বছর বয়সী একটি শিশুও রয়েছে বলে ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

তবে রয়টার্স মেহর নিউজের বরাতে নিহতের সংখ্যা পাঁচজন বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ এক প্রাদেশিক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে আহতের সংখ্যা ৬৮ বলে জানিয়েছে। বিয়ের অনুষ্ঠানে হতাহতের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বিবিসিকে বলেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।

 একাধিক দেশে ইরানের হামলার দাবি

মার্কিন হামলার পর আইআরজিসি পাল্টা অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। ইরানি সংবাদমাধ্যম তাসনিম জানিয়েছে, জর্ডানের আকাবায় একটি মার্কিন মেরিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।

জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ১০টি প্রতিহত করা হয়েছে এবং তিনটি প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে পড়ে। এ ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

ইরানি সংবাদমাধ্যমের দাবি, বাহরাইনে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। কুয়েতও জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা একটি ড্রোন হামলা মোকাবিলা করছে। এ ছাড়া উত্তর ইরাকের এরবিলে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে আইআরজিসি। হামলায় কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে ইরাক বা যুক্তরাষ্ট্র এ তথ্য নিশ্চিত করেনি।

হরমুজ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন করে সংঘাতে হরমুজ প্রণালি ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বেড়েছে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা এই জলপথ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। সংঘাতের আগে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ করা প্রতি পাঁচ ব্যারেল তেলের মধ্যে প্রায় এক ব্যারেল এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।

সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি চার ডলারের বেশি বেড়ে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। আইআরজিসির বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইরান যদি পারস্য উপসাগর দিয়ে তেল রপ্তানি করতে না পারে, তাহলে অন্যদের পক্ষেও সেখান থেকে তেল রপ্তানি করা সম্ভব হবে না। এর আগে সোমবার হরমুজ প্রণালি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার খবর প্রকাশিত হলে তেলের দাম আরও বাড়ে।

ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি

ইরানের পাল্টা হামলার পর দেশটির বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযানের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ইরান পাল্টা হামলা চালালে দেশটির ওপর আরও কঠোর ও বড় মাত্রার আক্রমণ চালানো হবে। ভবিষ্যতে আরও বড় হামলার প্রস্তুতি রয়েছে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

অন্যদিকে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে।

 ভেঙে পড়েছে আগের সমঝোতা

সাম্প্রতিক সংঘাতের আগে প্রায় এক মাস যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা তুলনামূলক কম ছিল। তবে সপ্তাহান্তে দুই দেশের মধ্যে আবার গোলাগুলি শুরু হয়। জুলাইয়ের পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে প্রথম বড় ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলা।

এর আগে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও সেখানে জাহাজ চলাচল নিয়ে দুই দেশের মতপার্থক্য থাকায় সেই সমঝোতা টেকেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও নতুন করে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আগের চুক্তিকে গুরুত্বহীন বলে মন্তব্য করেন।

তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আগের সমঝোতায় ফেরার অঙ্গীকার করলে তেহরানও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। ফলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লেও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।

মন্তব্য করুন