নেপালে 'ফ্লাশ ফ্লাড-ভূমিধস' লাশের দাফন শুরু, নিখোঁজ হাজারো
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৭ পিএম
সংগৃহীত ছবি
হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে শত শত মানুষের প্রাণহানির পর নেপালে উদ্ধার হওয়া মরদেহের দাফন শুরু হয়েছে। সোমবার থেকে মরদেহগুলো দাফনের পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন সেনাবাহিনী ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা। ভয়াবহ পানির স্রোতে বহু গ্রাম ও জনপদ ভেসে যাওয়ায় এখনো হাজারো মানুষের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে পরিবারের সদস্যরা হাসপাতাল ও উদ্ধারকেন্দ্রগুলোতে ভিড় করছেন। অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধারের কারণে মর্গগুলোতেও তৈরি হয়েছে তীব্র চাপ। অনেক পরিবারকে সেখানে গিয়ে স্বজনের মরদেহ শনাক্ত করতে হচ্ছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
গত বুধবার বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের ভয়াবহ স্রোত নেমে এসে নেপালের বিভিন্ন এলাকা এবং সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত করে। এ দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে অন্তত ৭৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রবল স্রোতে কিছু মরদেহ ভারতের ভূখণ্ডে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে।
দুর্যোগে এখনো অন্তত ৩ হাজার ৪৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে যাওয়া পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও রয়েছেন। নেপালের নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত ৯৩৩ জন শ্রমিক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
নেপালি সেনাবাহিনী ও প্রকৌশলীরা রোববার ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে ব্যাপক অভিযান চালান। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে টানেলের দিকে খননকাজ চালানোর পাশাপাশি উদ্ধারকারীরা সেখানে একটি পাইপ প্রবেশ করাতে সক্ষম হন।
দুর্যোগের সময় প্রাণে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা জানিয়েছেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের ৩৩ বছর বয়সী শ্রমিক সুরেন্দ্র দৌলুরি জানান, তিনি আপার ত্রিশূলী-১ প্রকল্পে কাজ করার সময় হঠাৎ প্রবল পানির স্রোতে পুরো এলাকা প্লাবিত হতে দেখেন। কাঠমান্ডুতে উদ্ধারের চার দিন পর এএফপিকে তিনি জানান, বিকট শব্দের পর টারবাইন ফ্লোর কাদা ও পানিতে ডুবে যায়। সেখানে ছয়জন শ্রমিক আটকা পড়েছিলেন। তাদের পাঁচজনকে উদ্ধার করা গেলেও একজন মারা যান।
অনেক শ্রমিক উঁচু জায়গা কিংবা নির্মাণ এলাকার এমন স্থানে আশ্রয় নিতে সক্ষম হন, যেখানে বন্যার স্রোত পৌঁছাতে পারেনি। তবে রাতভর বৃষ্টি ও নদীর পানি বাড়তে থাকায় রোববার উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হয়। নেপালি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, খনন করা এলাকায় পানি ঢুকে পড়ায় কিছু সময়ের জন্য কাজ বন্ধ রাখতে হয়। পরে পরিস্থিতির উন্নতি হলে উদ্ধারকাজ ফের শুরু করা হয়।
মরদেহ শনাক্তে ডিএনএ নমুনা
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, হিমবাহ ধসের ফলে পানি, বরফ ও বিপুল ধ্বংসাবশেষ নদীপথে নেমে এসে এই ভয়াবহ দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। প্রবল স্রোতের কারণে কয়েকটি বড় হ্রদও তৈরি হয়েছে। এসব জলাধার উদ্ধার অভিযানে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করছেন জরুরি বিভাগের কর্মীরা।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বত সীমান্তের একটি বন্দর এলাকায় ভূমিধসের পর নতুন একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে। ঝুঁকি বিবেচনায় রোববার সেখানে উদ্ধারকাজে নিয়োজিত চীনা কর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
চীনের হিসাবে, তিব্বতে এ পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, দেশটিতে নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৫০২ জনে দাঁড়িয়েছে। নেপালে নিশ্চিতভাবে ৭৮১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা এত বেশি যে পর্যাপ্ত হিমায়িত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই দাফন শুরু করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে প্রতিটি মরদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে নমুনা মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নিখোঁজদের স্বজনরা মরদেহ শনাক্তকেন্দ্রগুলোতে ভিড় করছেন। সেখানে উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি এলইডি স্ক্রিনে প্রদর্শন করা হচ্ছে। ভয়াবহ এসব দৃশ্য দেখে অনেক স্বজন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন এবং পরিচিত কাউকে শনাক্ত করার আশায় অপেক্ষা করছেন।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)