Logo
×

Follow Us

অর্থনীতি

জ্বালানি ব্যয় সামলাতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা চায় বাংলাদেশ

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৮ এএম

জ্বালানি ব্যয় সামলাতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা চায় বাংলাদেশ

সংগৃহীত ছবি

 

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বাড়তি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সাথে ব্যাংক খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর কাছে তুলে ধরছে সরকার।

বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার, ঋণের চাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবে শ্রমবাজারে পরিবর্তনের আশঙ্কার মধ্যে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা। সোমবার শুরু হওয়া এ সম্মেলন চলবে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত। এতে বিশ্বের ১৯১টি সদস্য দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, অর্থসচিব এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার প্রতিনিধিসহ ১৫ হাজারের বেশি প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন।

এবারের সভায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য উত্তেজনা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

জ্বালানি ব্যয়ে আর্থিক সহায়তা চায় ঢাকা

বার্ষিক সভার শুরুতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে বিশ্বব্যাংকের সাথে বাংলাদেশের আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে একটি কাঠামোগত চুক্তি নিয়েও কাজ এগোচ্ছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় মোকাবিলায় বাংলাদেশের আর্থিক সুরক্ষা প্রয়োজন। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। তার মতে, সহযোগিতার পরিসর শুধু বিদ্যমান তহবিলে সীমাবদ্ধ না রেখে বৈশ্বিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে বৈঠকে সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা ও শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা, কর অব্যাহতি ও অনিয়ম কমানো এবং রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানোকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে সরকার। এসব সংস্কার কার্যক্রমের মালিকানা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের হাতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই করা সহজ হবে বলে মনে করেন উপদেষ্টা। পাশাপাশি বন্ধ কলকারখানা চালু, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্নের আশঙ্কা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। তেল ও ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যায়। একইভাবে সারের মূল্যবৃদ্ধি কৃষি উৎপাদন ব্যয় এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ক্ষেত্রে জ্বালানির দাম বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও সরকারি ভর্তুকির ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট জ্বালানি ও মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা মোকাবিলায় ৩০ থেকে ৪০টি দেশের সাথে সম্ভাব্য জরুরি সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে বিভিন্ন উৎস থেকে সর্বোচ্চ ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও জানান তিনি। তবে এ অর্থ সম্ভাব্য বৈশ্বিক সহায়তার পরিসর; বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত কোনো বরাদ্দ নয়।

এদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এসব দেশকে বৈদেশিক ঋণদাতাদের প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে, যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সুদ বাবদ। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলার পাশাপাশি সামাজিক খাতে ব্যয় অব্যাহত রাখা দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইএমএফের সঙ্গে ৫০০ কোটি ডলারের ঋণ নিয়ে আলোচনা

বার্ষিক সভার সাইডলাইনে আইএমএফের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে ৪৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের নতুন ঋণসহায়তা প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা করছে বাংলাদেশ। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আগেই আইএমএফের কাছে পাঠানো হয়েছে। আলোচনায় অগ্রগতি হলে আগামী ডিসেম্বরে ঋণচুক্তি সই হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

নতুন ঋণসহায়তার ক্ষেত্রে কয়েকটি অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার, রাজস্বনীতি ও রাজস্ব প্রশাসনের পৃথকীকরণ, ব্যাংক খাতের তদারকি জোরদার, খেলাপি ঋণ কমানো, করছাড় যৌক্তিক করা এবং বিভিন্ন খাতে সরকারি ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে এসব সংস্কার বাস্তবায়নে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে নতুন ঋণ প্যাকেজের চূড়ান্ত পরিমাণ ও শর্ত নির্ভর করবে দুই পক্ষের আলোচনার অগ্রগতির ওপর।

এআইয়ের প্রভাবে বদলাতে পারে কর্মসংস্থান

বিশ্ব অর্থনীতির আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সোমবার ব্যাংককে বলেছেন, এআইয়ের বিস্তারে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরির কাজের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে, কিছু ক্ষেত্রে কাজের মান কমতে পারে কিংবা নির্দিষ্ট কিছু পদ বিলুপ্ত হতে পারে। উন্নত অর্থনীতিতে এ প্রভাব ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট সব চাকরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশ ধরে রাখতে সহায়তা করছে। একই সাথে প্রযুক্তিটির দ্রুত বিস্তার শ্রমবাজার, শিক্ষা ও করব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ

উন্নয়ন অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোও এবারের বার্ষিক সভার অন্যতম লক্ষ্য। অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকারি সম্পদের পাশাপাশি বেসরকারি পুঁজি কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ।

বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে চীন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগের কথা জানিয়েছেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এ ছাড়া থাইল্যান্ডের সাথে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ফল সংরক্ষণ ও হালাল খাদ্যপণ্যের বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

একই সাথে চট্টগ্রাম ও থাইল্যান্ডের রেনং বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাংলাদেশের রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।

মন্তব্য করুন