Logo
×

Follow Us

অর্থনীতি

স্মার্টফোন দিয়ে ‘বাংলা কিউআর’-এ লেনদেন, বিপ্লবের দোরগোড়ায় বাংলাদেশ

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৯ এএম

স্মার্টফোন দিয়ে ‘বাংলা কিউআর’-এ লেনদেন, বিপ্লবের দোরগোড়ায় বাংলাদেশ

বাংলা কিউআর

বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের আর্থিক লেনদেন ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনতে ‘বাংলা কিউআর’-এর পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে এই ব্যবস্থার চতুর্থ ধাপ চালুর মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির (পিটুপি) মধ্যে কিউআর কোড ব্যবহার করে অর্থ লেনদেনের সুযোগ সম্প্রসারণের কথা রয়েছে। এতে রিকশাভাড়া, বাসভাড়া, ক্ষুদ্র কেনাকাটা ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে অর্থ আদান-প্রদানের মতো দৈনন্দিন লেনদেনে নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বজনীন পেমেন্ট ব্যবস্থা বাংলা কিউআরের এই সম্প্রসারণের লক্ষ্য হলো ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে আরো বেশি মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আনা। এ ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের পরিবর্তে ব্যক্তিগত কিউআর কোড ব্যবহার করে অর্থ গ্রহণ ও পাঠানোর সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে রিকশাচালক, বাসের সহকারী, হকার, সবজি বিক্রেতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মতো অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষের জন্য ডিজিটাল লেনদেন সহজ হতে পারে।

এখন পর্যন্ত ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বড় বিপণিবিতান ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তুলনামূলক বেশি দৃশ্যমান। বাংলা কিউআরের নতুন ধাপ বাস্তবায়িত হলে রাস্তার পাশের চায়ের দোকান, ফুটপাতের সবজি বিক্রেতা, জুতার মেরামতকারী কিংবা সেলুনের মতো ছোট পরিসরের সেবাদাতাদের কাছেও ডিজিটাল পেমেন্টের সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে অল্প অঙ্কের লেনদেনেও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা সহজ হবে।

খুচরা টাকার ঝামেলা কমানোর সম্ভাবনা

দৈনন্দিন লেনদেনে খুচরা টাকার অভাব ও ভাংতি ফেরত পাওয়ার সমস্যা দীর্ঘদিনের। কিউআর কোডের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা গেলে ক্রেতা নির্ধারিত অঙ্কের টাকা সরাসরি পাঠাতে পারবেন। ফলে ২৩ বা ৪৭ টাকার মতো নির্দিষ্ট অঙ্কের বিল পরিশোধে বাড়তি টাকা দেয়া কিংবা ভাংতির জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন কমবে। একই সাথে ছেঁড়া ও ময়লা নোট ব্যবহারের বিড়ম্বনাও হ্রাস পেতে পারে।

ব্যক্তিগত লেনদেন ও ডিজিটাল সহায়তা

ব্যক্তিগত কিউআর কোডের মাধ্যমে অর্থ আদান-প্রদানের সুযোগ চালু হলে ছোট অঙ্কের আর্থিক সহায়তা ও দানও ডিজিটালভাবে দেয়া সম্ভব হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সেবাদাতার নিয়ম, অ্যাকাউন্টের ধরন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। ব্যক্তিগত কিউআর কোড ব্যবহার করে অননুমোদিতভাবে নগদ উত্তোলন বা অন্য কোনো নিষিদ্ধ কার্যক্রম পরিচালনা করলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।

অ্যাপ ব্যবহারে সহজতার ওপর গুরুত্ব

ডিজিটাল লেনদেন জনপ্রিয় করতে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাপগুলোতে বাংলা কিউআর সুবিধা সহজে খুঁজে পাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি কিউআর কোডের ছবি বা স্ক্রিনশট ব্যবহার করে লেনদেনের সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। তবে অ্যাপের নকশা, লেনদেনের সীমা ও সুবিধাগুলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যকর নির্দেশনার ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

লেনদেনের মাশুলের বিষয়টিও এ ব্যবস্থার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা কিউআরের মাধ্যমে সব ধরনের লেনদেনে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীর জন্য শূন্য মাশুল কার্যকর হলে ছোট অঙ্কের অর্থ পরিশোধে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারে উৎসাহ বাড়তে পারে। একইভাবে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ জমা হওয়ার সুবিধা থাকলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের লেনদেন ব্যবস্থাপনা সহজ হতে পারে। তবে মাশুল ও অর্থ জমার সময়সীমা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক সেবাদাতার শর্ত যাচাই করা জরুরি।

বাংলা কিউআরে লেনদেন বাড়ছে

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুনে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ৩৭ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দৈনিক গড়ে ১৪৩ কোটি থেকে ১৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। দেশে প্রায় ৪০ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর চালু রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য, ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি আরও বাড়িয়ে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা।

সাইবার নিরাপত্তায় সতর্কতা জরুরি

কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন সহজ হলেও নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। টাকা পাঠানোর আগে অ্যাপে প্রদর্শিত প্রাপকের নাম যাচাই করা জরুরি। একইভাবে অর্থ গ্রহণকারীকে নিজের মোবাইলে আসা এসএমএস, অ্যাপের লেনদেনের বিবরণ কিংবা ব্যালেন্স দেখে টাকা জমার বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে। শুধু অন্য ব্যক্তির ফোনে দেখানো সফল লেনদেনের বার্তার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।

বাংলাদেশে নগদবিহীন লেনদেন সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট সহজলভ্য হলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার ঝামেলা কমবে এবং লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে নতুন ধাপের কার্যকর তারিখ, লেনদেনের সীমা, মাশুল ও ব্যক্তিগত কিউআর ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা অনুসরণ করেই এ সুবিধা গ্রহণ করা উচিত।

মন্তব্য করুন