বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে অর্থনীতির চাপের চিত্র
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৯ এএম
বিশ্বব্যাংক
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ কমে যাওয়া, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, ধীরগতির জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত গতি না থাকার বিষয়গুলো উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। একই সাথে রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রবণতার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের এই মূল্যায়ন নিয়ে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের মতে, অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সহজ ও উদার অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও বিকেএমইর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে বলেন, প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্কের সুযোগ থাকলেও দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদনে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তার মতে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্রগুলো কাজে লাগানো এবং বিনিয়োগ নীতি ও কৌশলে সংস্কার আনা দরকার।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ওই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ২ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে এটিই সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধি কমার অন্যতম কারণ হিসেবে বিনিয়োগের সংকোচনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নও নেমেছে রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে অনেক শিল্পকারখানা তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারেনি। কোথাও কর্মঘণ্টা কমানো হয়েছে, কোথাও উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ের পথেও গেছে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনীতি ও বেসরকারি খাতে আস্থা ফেরার যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তার মতে, প্রশাসনিক সংস্কার, ব্যবসায়িক ব্যয় কমানো এবং সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স (অ্যামচেম) বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, অর্থনীতি সচল রাখতে আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং বন্দরসেবার মান উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশে নেমেছে। ওই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন ০ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে শিল্প খাতে এটিই প্রথম সংকোচন।
শিল্প খাতের জন্য গ্যাস সংকটও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। দেশের মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে। কয়েকটি বড় গ্যাসক্ষেত্র ও মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে কোনো একটি স্থাপনায় সমস্যা দেখা দিলে সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
এদিকে মূল্যস্ফীতিও অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। গত আগস্টে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে এখনো উঁচুতে রাখার অন্যতম কারণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের অধ্যাপক ড. বিরূপাক্ষ পাল বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বলেন, স্বাভাবিক সময়ে প্রবৃদ্ধির হার এভাবে কমে যাওয়া উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, বিনিয়োগ ছাড়া প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব নয়। অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান তৈরি, বন্ধ হয়ে থাকা কারখানা চালু এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতার কাঠামো পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
ব্যাংক খাতের পরিস্থিতিকেও অর্থনীতির বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ইসলামী ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ।
ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধনও দুর্বল হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতের মূলধন ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে, যেখানে নিয়ন্ত্রক কাঠামো অনুযায়ী ন্যূনতম হার ১০ শতাংশ থাকার কথা।
অন্যদিকে ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রবৃদ্ধি গত জুনে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ফজলুল হক বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে শিল্পকারখানা চালু রাখতে প্রণোদনার উদ্যোগকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে আরও সহযোগিতামুখী হতে হবে।
রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতাও অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের রাজস্ব আদায় ছিল জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম নিম্ন হার। এর ফলে বাজেট ঘাটতি বেড়ে জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এতে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
উচ্চ সুদের হার ও জ্বালানি সংকটের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ টানা দ্বিতীয় বছরের মতো কমেছে। একই সময়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ১৫ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। নতুন ইকুইটি বিনিয়োগের পরিমাণ কমেছে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ।
ড. বিরূপাক্ষ পালের মতে, অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পর্যালোচনা, সংস্কার এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে নতুন করে সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশে আস্থা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
তবে অর্থনীতির নানা সূচকে চাপ থাকলেও রেমিট্যান্স এখনো আশার জায়গা হয়ে আছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, গত অর্থবছরে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। এই অর্থপ্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে সহায়তা করেছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, রেমিট্যান্সের এই প্রবাহকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কাজে লাগানো জরুরি। তাঁর মতে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রভাবও অর্থনীতিতে পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একাধিক ঝুঁকি ও দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, ব্যাংক খাতের সংস্কার, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং ব্যবসায়িক আস্থা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আবারও গতিশীল করার উদ্যোগ নেয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)