Logo
×

Follow Us

অর্থনীতি

নয় মাসে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমেছে

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম

নয় মাসে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমেছে

নয় মাসে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমেছে

ব্যাংক খাতে সংস্কার কার্যক্রম ও ঋণ আদায়ে জোরালো উদ্যোগের প্রভাবে গত নয় মাসে খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে যেখানে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ ছিল খেলাপি, ২০২৬ সালের জুনে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে।

তবে অনুপাত কমলেও খেলাপি ঋণের মোট অঙ্ক এখনো বড়। জুন শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট খেলাপি ঋণের অঙ্ক সামান্য বাড়লেও মোট ঋণের তুলনায় অনুপাত কমেছে।

ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম এবং হিসাবের আড়ালে থাকা ঋণ শনাক্ত করে প্রকৃত চিত্র প্রকাশের প্রক্রিয়ার মধ্যেই খেলাপি ঋণের অনুপাতে এই পরিবর্তন এসেছে। এতে একদিকে অনুপাতের হিসাবে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্রও আগের তুলনায় স্পষ্ট হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত অবস্থা সামনে আনার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর ফলে আগে গোপন থাকা কিংবা পুনঃতফসিলের মাধ্যমে আড়াল করা অনেক ঋণের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পেয়েছে। খেলাপি ঋণ কমাতে এককালীন প্রস্থান নীতি এবং সর্বোচ্চ ১৫ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পাওয়া গেলে খেলাপি ঋণের অনুপাত আরো কমতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রকাশিত খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান ব্যাংক খাতের প্রকৃত সমস্যার পুরো চিত্র তুলে ধরেনি। তার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে খেলাপি ঋণ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা থাকলেও ২০২৪ সালে সরকারি হিসাবে তা প্রায় ২ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছায়। তবে শ্বেতপত্রে প্রকৃত খেলাপি ও সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা বলে উঠে এসেছে।

ব্যাংক খাতের সংস্কারকে স্বাগত জানিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সংকট কাটিয়ে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারে এসব সংস্কার জরুরি। একই সাথে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো এবং খেলাপি ঋণ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ব্যাংকের হিসাব-নিকাশ স্বচ্ছ করার প্রক্রিয়ায় স্বল্পমেয়াদে চাপ তৈরি হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর মাধ্যমে আরও শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। এজন্য পেশাদার ব্যবস্থাপনা, যথাযথ ঋণ মূল্যায়ন এবং কার্যকর আদায় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপি ঋণের অনুপাত কমার প্রবণতা ইতিবাচক হলেও এটিকে এখনই চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। প্রকৃত খেলাপি ঋণ শনাক্ত ও প্রকাশের প্রক্রিয়ায় কোনো কোনো সময়ে অনুপাত বেড়েও যেতে পারে। তাই ব্যাংকের হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে প্রকৃত আর্থিক অবস্থান প্রকাশ করাই টেকসই সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

এদিকে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর জন্য সংস্কার কাঠামো জোরদার করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদনের মানদণ্ড আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি (ইসিএল) হিসাব চালু হলে ভবিষ্যৎ ঋণঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করার সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, শুধু প্রকাশিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানো নয়, এর পেছনের কাঠামোগত সমস্যাগুলোও দূর করতে হবে। ঋণ আদায় বাড়ানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ঋণ বিতরণে কঠোর যাচাই-বাছাই এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত নয় মাসে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমার বিষয়টি ব্যাংক খাতের সংস্কারে প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই অগ্রগতি কতটা স্থায়ী হয়েছে, তা বোঝার ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। ধারাবাহিক সংস্কার, ঋণ আদায় ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে খেলাপি ঋণ কমার পাশাপাশি আমানতকারীদের আস্থা এবং ব্যাংক খাতে ঋণশৃঙ্খলাও শক্তিশালী হতে পারে।

মন্তব্য করুন