সংগৃহীত ছবি
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এ সরকারি চাকরিজীবীদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬ পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পাবেন। তবে ওপরের গ্রেডগুলোতে ইনক্রিমেন্টের হার ধাপে ধাপে কমবে। নতুন বেতন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে এবং সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার ও সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, গ্রেড-৫-এ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হবে ৪ শতাংশ। গ্রেড-৪ ও ৩-এ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পান। ফলে নতুন কাঠামোয় উচ্চতর গ্রেডে মূল বেতন বেশি হলেও শতাংশের হিসাবে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার কমে যাবে।
সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের কাঠামো রাখা হচ্ছে। ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং নিচের পদগুলোতে ৫ শতাংশ, মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পদে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব রয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে ২০২৪ সালে চালু হওয়া বিশেষ প্রণোদনাও বাতিল হবে। প্রথমে ৫ শতাংশ এবং পরে ১০ শতাংশ করা ওই প্রণোদনার পরিবর্তে নতুন পে-স্কেলের কাঠামো অনুযায়ী বেতন-ভাতা নির্ধারিত হবে।
গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন করা হয়। একই বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়।
নতুন পে-স্কেলে শুধু মূল বেতন নয়, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, মোবাইল, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ঢাকার সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়িভাড়া মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশের পরিবর্তে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভারে তা ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ এবং এর বাইরের এলাকায় ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। তবে মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ায় শতাংশ কমলেও অনেক ক্ষেত্রে ভাতার প্রকৃত অর্থের পরিমাণ বাড়বে।
উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করলে পদোন্নতি না হলেও উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন কাঠামোয় এ সময় কমিয়ে ৮ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে একই গ্রেডে আরও ছয় বছর চাকরির শর্ত থাকবে। পদোন্নতিযোগ্য পদে কর্মরতরা চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার এ সুবিধা পাবেন।
পদোন্নতির সুযোগ নেই এমন ‘ব্লকড পদে’ কর্মরতদের জন্য সর্বোচ্চ তিনবার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রাখা হচ্ছে। প্রথমবার আট বছর, দ্বিতীয়বার আরো ছয় বছর এবং তৃতীয়বার পরবর্তী আট বছর চাকরির পর এ সুবিধা পাওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
চিকিৎসা ভাতাতেও পরিবর্তন আসছে। নতুন কাঠামোয় ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সী সরকারি কর্মচারীরা মাসে ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৪ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা পাবেন। পেনশনভোগীদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের ৫ হাজার এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের ৬ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এবার প্রথমবারের মতো সব স্তরের সরকারি কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা মাসে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা পাবেন। পাশাপাশি যাতায়াত ভাতা ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ থেকে ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলা নববর্ষ ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাহাড়ি এবং হাওড়, দ্বীপ ও চরভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশই থাকছে। ঝুঁকি ভাতাসহ কয়েকটি বিশেষ ভাতার পরিমাণ বিদ্যমান হারের তুলনায় ২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। তবে শিক্ষা সহায়ক, কার্যভার, আপ্যায়ন, কুক অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যালাউন্স, উৎসব এবং শ্রান্তি-বিনোদন ভাতার বর্তমান হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আসছে। নন-কমব্যাট্যান্ট (এনরোল্ড) বা এনসি (ই) ও সমতুল্য পদের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার টাকা এবং মেজর জেনারেল ও সমপদের বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদকে গ্রেড-২ এবং কর্নেল ও সমপদকে গ্রেড-৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বিমানবাহিনীর বিভিন্ন বিশেষ বেতন ও ভাতাও পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফ্লাইং পে ছাড়াও কমান্ড, স্টাফ, টিচিং, কোয়ালিফিকেশন, ডিস্টার্বেন্স ও বিশেষজ্ঞ বেতন ১০ শতাংশ এবং দক্ষতা, নিযুক্তি, প্যারাসুট, কমান্ডো/স্নাইপার, স্কুবা ডাইভিং ও সদাচরণ বেতন ১৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। জরিপ ভাতা বাড়তে পারে ৩০ শতাংশ।
সচিব কমিটি সশস্ত্র বাহিনীর বিদ্যমান ৮১ ধরনের ভাতাও পর্যালোচনা করেছে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা ভাতা, কিট ভাতা, ডেঞ্জার মানি, দোভাষী ও শিক্ষকতা ভাতাসহ বেশিরভাগ ভাতা ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বাড়িভাড়া, যাতায়াত, কার্যভার, আপ্যায়ন, টিফিন, ধোলাই, পাহাড়ি, উৎসব, শ্রান্তি-বিনোদন, নববর্ষ, শিক্ষা সহায়ক, চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতা নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হবে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত রয়েছে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)