Logo
×

Follow Us

অর্থনীতি

আইএমএফের শর্তে সরকারের ভিন্নপথ

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৭ এএম

আইএমএফের শর্তে সরকারের ভিন্নপথ

আইএমএফের শর্তে সরকারের ভিন্নপথ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণসংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বাস্তবায়নে আগের অবস্থান থেকে সরে আসছে সরকার। ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারনির্ভর করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা, সুদের হার না কমানো, জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় এবং ভর্তুকি কমানোর মতো শর্তে সরকারের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বরং সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে এসব বিষয়ে সরকার তুলনামূলক জনবান্ধব অবস্থান নিচ্ছে।

সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশের স্বার্থের পরিপন্থি কোনো শর্ত মেনে আইএমএফের সাথে নতুন ঋণচুক্তি করবে না সরকার। সরকারের এই অবস্থানের মধ্যেই আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাটির সাথে নতুন ঋণচুক্তির আলোচনা এগোচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার আইএমএফের কাছে নতুন ঋণ সহায়তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে। একই সঙ্গে আগের সরকারের করা ঋণচুক্তি বাতিল করে নতুন চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই ঢাকা সফর করে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে।

সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে আইএমএফ একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করবে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন শর্ত নির্ধারণ করতে পারে। এসব বিষয় নিয়ে আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার সাইডলাইনে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানেই নতুন ঋণচুক্তির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশের সাথে আইএমএফের কোনো কার্যকর নতুন ঋণচুক্তি নেই। আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় করা চুক্তিটি নতুন সরকার আইএমএফের সাথে আলোচনার মাধ্যমে বাতিল করেছে। ফলে এখন নতুন ঋণচুক্তি নিয়েই দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে আগের ঋণের কোনো কিস্তি পরিশোধ বাকি থাকলে সংশ্লিষ্ট শর্তগুলো মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ কারণে আগের ঋণচুক্তির কিছু শর্ত এখনো বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইএমএফের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল ডলারের বিনিময় হারকে পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া এবং এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ না করা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ও হস্তক্ষেপের নজির দেখা গেছে। আগস্টের শুরুতে ডলারের দাম বাড়তে থাকলে আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের দাম ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার মধ্যে রাখার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দাম ১২২ টাকা ৭৭ পয়সায় নেমে আসে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, ডলারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপরও চাপ পড়ে। বাজারে কারসাজির মাধ্যমে দাম বাড়ানোর প্রবণতা ঠেকাতেও নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি প্রয়োজন বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার বিষয়টিও আইএমএফের শর্তের মধ্যে ছিল। কিন্তু আগস্টের শুরুতেই নীতি সুদের হার কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণের সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সুদের হার কমানোর এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের দাম নির্ধারণ এবং বিভিন্ন খাতে সরকারি ভর্তুকি কমানোর শর্ত নিয়েও সরকারের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এসব শর্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করলে সাধারণ ভোক্তার ব্যয় বাড়তে পারে—এমন বিবেচনায় সরকার ধীরে এগোচ্ছে।

আইএমএফের আরেকটি শর্ত হলো বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভের হিসাব প্রকাশ এবং ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমানো। তবে বর্তমানে স্বল্পমেয়াদি দায় বাদ দিয়ে নিট রিজার্ভের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হচ্ছে না। বিভিন্ন তহবিলে বিনিয়োগ করা অর্থ বাদ দিয়ে প্রকাশিত রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার।

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রেও এখনো কার্যকর অগ্রগতি নেই। বরং আগের সরকারের সময়ে বিতরণ করা বিভিন্ন ঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ হওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে একদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়াতে হবে। নতুন ঋণচুক্তির আলোচনায় দেশের বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শর্ত নির্ধারণ করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মন্তব্য করুন