যুব উন্নয়নের প্রশ্নফাঁস: পাঁচ সরকারি কর্মচারীসহ গ্রেপ্তার ৭
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
সংগৃহীত ছবি
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পাঁচ সরকারি কর্মচারীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৩)। চক্রটি চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র সরবরাহের বিনিময়ে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করত বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র, প্রবেশপত্র, সনদপত্র, ব্যাংক চেক, স্ট্যাম্প ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন। তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।
গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্যপদের বিপরীতে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। সকাল ১১টায় পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত সময় থাকলেও সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর ছায়া তদন্ত শুরু করে এসআরবি। এর ধারাবাহিকতায় ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় গত ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়েছিল।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে পাঁচ সরকারি কর্মচারী
এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), চাকরিপ্রত্যাশী মো. মফিজুল ইসলাম (২৩), হাসিনুর রহমান সুজন (৩২), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩), এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০) এবং একই সংস্থার কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮)।
তিনি বলেন, ১৪ অক্টোবর মতিঝিল এলাকা থেকে রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরখান থেকে ইমদাদুল ইসলাম এবং এসআরবি-৪-এর সহায়তায় মিরপুর-১০ এলাকা থেকে আসাদুল ইসলামকে আটক করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের কথোপকথন ও বার্তা পর্যালোচনা করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৫ অক্টোবর সাভার থেকে নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে ১৬ অক্টোবর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
যেভাবে ছড়ানো হয় প্রশ্নপত্র
সংবাদ সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের চ্যাট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে নূর মোহাম্মদ একটি সূত্র থেকে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের স্পষ্ট ছবি পাঠান।
এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলকে পাঠান। পরে চক্রের সদস্য এবং তাঁদের সাথে যোগাযোগ থাকা পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র ও উত্তর পৌঁছে দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় আসাদুল, রুবেল, মফিজুল ও সুজন যুক্ত ছিলেন বলে জানিয়েছে তদন্ত দল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালাত। তবে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
ফেসবুকের সূত্র যাচাই করছে তদন্ত দল
প্রশ্নপত্র কোথা থেকে এসেছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক বলেন, নূর মোহাম্মদ দাবি করেছেন, তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পেয়েছেন। জাহাঙ্গীরও একই ধরনের দাবি করেছেন। তবে তাঁদের বক্তব্য এখনো নির্ভরযোগ্য হিসেবে নিশ্চিত করা যায়নি। তাঁরা যেসব ফেসবুক গ্রুপ ও আইডির কথা বলেছেন, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এ ঘটনায় জড়িত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ওই অধিদপ্তরের কারও সম্পৃক্ততার সরাসরি তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অন্যান্য সরকারি দপ্তরের কর্মচারীদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তের অগ্রগতিতে এ বিষয়ে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
উদ্ধার হয়েছে স্ট্যাম্প, চেক ও সনদপত্র
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, ১০টি সনদপত্র, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা ও একটি ব্যাংক চেক, আটটি মোবাইল ফোন, বিভিন্ন ক্যাটাগরির আরও ১৫টি সনদপত্র, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নগদ চার হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন আরো জানান, চক্রের এক সদস্যের মাধ্যমে প্রতারিত হওয়ার পর মফিজুল ইসলাম বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় এ কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের তথ্যও সামনে এসেছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস, অর্থ লেনদেনের পুরো প্রক্রিয়া এবং চক্রের সাথে আরো কারা জড়িত, তা শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)