সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তার স্ত্রী রুকমিলা জামান ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের নামে দেশে-বিদেশে থাকা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ আদালতের আদেশে ক্রোক, জব্দ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ নয় দেশে এসব সম্পদের সন্ধান পেয়েছে সংস্থাটি। সর্বশেষ সিঙ্গাপুরেও ব্যাংক ও বিনিয়োগ হিসাব, একটি কোম্পানিতে পরিচালকের পদ এবং একটি বাড়ির তথ্য পেয়েছে দুদক।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, জাবেদকে ঘিরে ব্যাংক ঋণ, অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ ও অর্থপাচারের অভিযোগে এখন পর্যন্ত ৩৩টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় অভিযোগের পরিমাণ ৬১৮ কোটি টাকার বেশি। এর বাইরে আরো প্রায় এক হাজার কোটি টাকার দুটি বড় অভিযোগ এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ অনুসন্ধান করছে সংস্থাটি।
দুদকের অভিযোগ, জাবেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও তাদের স্বজনদের ব্যবসায়ী পরিচয়ে ব্যাংক ঋণ বের করে নেয়া হয়েছে। ইমিনেন্ট ট্রেডার্স, ভিশন ট্রেডিং, রিলায়েবল ট্রেডিং, প্রগ্রেসিভ ট্রেডিং, মডেল ট্রেডিং ও ক্রিসেন্ট ট্রেডার্সের নামে নেয়া ছয়টি ঋণে ১২৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ছয়টি মামলা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, শ্রমিক, কৃষক, রিকশাচালক, নাপিত ও টেইলরের মতো নিম্নআয়ের মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি ব্যবহার করে তাদের ব্যবসায়ী সাজিয়ে ঋণ নেয়ার অভিযোগ। এ ঘটনায় ১৯টি মামলায় অভিযোগের পরিমাণ ১৩৪ কোটি টাকার বেশি। দুদকের নথিতে এসব ঋণের ক্ষেত্রেও দ্রুত ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যাংক হিসাব খোলা, অল্প সময়ের মধ্যে বড় অঙ্কের ঋণের আবেদন এবং দ্রুত অনুমোদনের তথ্য রয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ঋণের অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের পর নগদে তুলে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। পরে সেই অর্থ ব্যবসার আয় হিসেবে ব্যাংকে জমা দিয়ে টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফারের (টিটি) মাধ্যমে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো এবং বিদেশে সম্পত্তি কেনার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া পাঁচটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২১৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগে পাঁচটি মামলা করেছে দুদক। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে থার্মেক্স নিট ইয়ার্ন, এইচএম শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রিজ, ওয়েল মার্ট, সাইফ পাওয়ারটেক ও ই-ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আইকনএক্স সার্ভিস রয়েছে।
জাবেদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান আরামিট সিমেন্টের নামে ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধান করছে দুদক। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ইউসিবি ও আইএফআইসি ব্যাংকের মাধ্যমে আরো ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দেশেও জাবেদের সম্পদের বড় একটি অংশের তথ্য পেয়েছে দুদক। সংস্থাটির নথিতে ঢাকার দুটি ও চট্টগ্রামের ১০টি ফ্ল্যাট, একটি মার্কেটের নয়টি দোকান, ২৭টি জমি এবং সাতটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তথ্য রয়েছে। ঢাকার গুলশানে দুটি ফ্ল্যাট ক্রোকের পর সেগুলোর ব্যবস্থাপনায় দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালককে রিসিভার করা হয়েছে। এসব ফ্ল্যাট থেকে আসবাব, পোশাক, গয়না, গাড়ির চাবি ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীসহ ২৬০ ধরনের জিনিসের তালিকা করা হয়েছে।
আনোয়ারায় থাকা ২৭টি জমির বড় অংশও দুদক যাচাই করেছে। আদালতের আরেক আদেশে ওই এলাকায় ৯৫৭ বিঘা জমি ক্রোক এবং ২৩টি কোম্পানির ১০২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা মূল্যের শেয়ার অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের কালুরঘাট শিল্প এলাকায় জাবেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সাতটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি আংশিক চালু এবং ছয়টি বন্ধ পাওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো আরামিট পিএলসি, আরামিট সিমেন্ট, আরামিট থাই অ্যালুমিনিয়াম, আরামিট ফুটওয়্যার, আরামিট স্টিল পাইপস, আরামিট অ্যালু কম্পোজিট প্যানেলস ও আরামিট পাওয়ার। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় তিন সদস্যের রিসিভার কমিটির প্রস্তাবেও আদালত অনুমোদন দিয়েছে।
বিদেশে জাবেদের সবচেয়ে বেশি সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে যুক্তরাজ্যে। দেশটির কোম্পানি ও ভূমি নিবন্ধনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০২৪ সালে ব্লুমবার্গ জাবেদ ও রুকমিলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩৫৮টি সম্পত্তির তথ্য প্রকাশ করেছিল। পরে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি তাদের সংশ্লিষ্ট ৩৪২টি সম্পত্তি ফ্রিজ করে। দুদকের পরবর্তী অনুসন্ধানে যুক্তরাজ্যে ৫১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফিলিপিন্স, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে জাবেদ ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্টদের সম্পদ রয়েছে। এসব দেশে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ আদালতের আদেশে ক্রোক, জব্দ বা অবরুদ্ধের আওতায় এসেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সর্বশেষ সিঙ্গাপুরে আটটি ব্যাংক বা বিনিয়োগ হিসাব, একটি কোম্পানিতে পরিচালকের পদ এবং একটি স্থাবর সম্পত্তির তথ্য পেয়েছে দুদক। সংস্থাটির আবেদনে বলা হয়েছে, জাবেদ ও রুকমিলার নামে ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে তিনটি যৌথ ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। ফার্স্ট আবু ধাবি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ডিবিএসের হিসাবের তথ্যও পাওয়া গেছে। এছাড়া জাসা ওশান পিটিই লিমিটেডে ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জাবেদ পরিচালক ছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদক বলছে, বিদেশে থাকা এসব সম্পদ হস্তান্তর বা বিক্রি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির আওতায় (এমএলএআর) সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশে সম্পদ শনাক্ত করলেই তা বাংলাদেশে ফেরত আনা যায় না; প্রথমে সম্পদের সঙ্গে অপরাধের যোগসূত্র প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
তবে বিদেশে থাকা সম্পদ নিয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। তার দাবি, তার বাবা প্রয়াত এমপি আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর সময় থেকেই তাদের পরিবারের বিদেশে ব্যবসা রয়েছে। বৈধ ব্যবসার আয় ও ব্যাংক ঋণের অর্থ দিয়ে বিদেশে সম্পত্তি কেনা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। জাবেদের ভাষ্য, তার বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)