পাওনা টাকা চাওয়ায় ব্যবসায়ীকে হত্যা, মাটিচাপা
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০৪ পিএম
শেখ ওয়াসিম রনী ,মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরী
রাজধানীর লালবাগে তিন লাখ টাকা পাওনাকে কেন্দ্র করে শেখ ওয়াসিম রনী (৪৭) নামে এক ব্যবসায়ীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর একটি পাঁচতলা ভবনের নিচতলার পাশের মাটি খুঁড়ে তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরী নামে তার এক পরিচিতকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে লালবাগের ৯ নম্বর বি সি দাস স্ট্রিটের একটি পাঁচতলা ভবনে অভিযান শুরু করে পুলিশ। দীর্ঘ সময় তল্লাশির পর শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ভবনের নিচতলার পাশের মাটি খুঁড়ে ওয়াসিম রনীর লাশ উদ্ধার করা হয়। অভিযানে পুলিশ, সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ও ডিবির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
পুলিশ জানায়, লাশ উদ্ধারের সময় ওয়াসিমের হাত-পা প্লাস্টিকের রশি দিয়ে বাঁধা ছিল এবং মুখ পলিথিন দিয়ে মোড়ানো ছিল। লাশটি অর্ধগলিত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। মৃত্যুর সঠিক কারণ ও ধরন ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিহতের স্বজনদের ভাষ্য, ওয়াসিম ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিলেন। যে ভবনের পাশ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, ওই ভবনের নিচতলায় মাসুম চৌধুরীর ইমিটেশন জুয়েলারির পাইকারি কারখানা ছিল। ওয়াসিমের শ্যালক মুরাদ হোসেন জানান, তিন লাখ টাকা ফেরত দেয়ার বিষয়টি নিয়ে ওয়াসিমের সাথে মাসুমের বিরোধ চলছিল।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৮ সেপ্টেম্বর ওয়াসিমের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সর্বশেষ যোগাযোগ হয়। ওই দিন তিনি তিন লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে একটি চেক নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তবে দুপুরের পর থেকেই তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।
একপর্যায়ে ওয়াসিমের স্বজনরা মাসুমের বাসায় গিয়ে তার স্ত্রীর সাথে কথা বলেন। তিনি ওয়াসিম সম্পর্কে কোনো তথ্য জানেন না বলে জানান। শুধু জানান, ওয়াসিম বাসায় এসেছিলেন এবং পরে চলে গেছেন। দীর্ঘ সময়েও ওয়াসিমের সন্ধান না পাওয়ায় স্বজনরা লালবাগ থানায় যোগাযোগ করেন।
এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ৮ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা ৫৫ মিনিটের দিকে ওয়াসিমের শ্যালক মুরাদ হোসেনের মোবাইল ফোন থেকে মাসুমের সাথে যোগাযোগ করা হয়। মাসুম তখন নিজেকে ইস্কাটন এলাকায় থাকার কথা জানান এবং কাজ শেষ করে তাদের সাথে দেখা করবেন বলে জানান। পরে রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে তিনি স্বজনদের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর তাকে সঙ্গে নিয়ে লালবাগ থানায় গিয়ে ওয়াসিম নিখোঁজের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করার আবেদন করা হয়। জিডির নম্বর ৪২৬, তারিখ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
পুলিশ তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়ার পাশাপাশি মাসুমকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। একপর্যায়ে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লালবাগ থানার ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বি সি দাস স্ট্রিটের ৯ নম্বর বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। সেখানকার নিচতলার খালি জায়গার পাশের মাটি খুঁড়ে ওয়াসিমের লাশ উদ্ধার করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাসুমের বোনের জামাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় আট মাস আগে ওয়াসিমের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা নিয়েছিলেন মাসুম। ওই টাকার বিপরীতে প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করায় দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয় বলে তিনি দাবি করেন।
তার দাবি, গত ৮ সেপ্টেম্বর পাওনা টাকা চাইতে ওয়াসিম মাসুমের ব্যবসায়িক কক্ষে যান। সেখানে টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির সময় মাসুম ওয়াসিমের মাথায় ঘুষি মারেন বলে পুলিশের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন। পরে ওয়াসিম অচেতন হয়ে পড়লে তাকে ভবনের পাশের মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয় বলে তার দাবি।
নিহতের শ্যালক মুরাদ হোসেনের অভিযোগ, ওয়াসিমের লাশ গোপন করতে আট বস্তা মাটি এনে তাকে চাপা দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, তার বোনের স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন তিনি।
এজাহারে বলা হয়েছে, মাসুম ওয়াসিমের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন এবং তিন মাসের মধ্যে তা পরিশোধ করার কথা ছিল। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও টাকা ফেরত না দেয়ায় ওয়াসিম পাওনা আদায়ের জন্য মাসুমের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বেলা ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে সেখানে তাকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়।
তবে এজাহারের একটি অংশে হত্যাকাণ্ডের স্থান ও সময় নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে ৬ সেপ্টেম্বর রাত ৩টা ৪৫ মিনিট থেকে ভোর ৪টা ৫ মিনিটের মধ্যে লালবাগ থানার ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টারের ৮৭ নম্বর ফ্ল্যাটের ৪ নম্বর ভবনের সামনের খোলা মাঠে মারধর করে হত্যার অভিযোগের কথা উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে একই এজাহারে বি সি দাস স্ট্রিটের ৯ নম্বর বাড়ির নিচতলার খালি জায়গা থেকে হাত-পা বাঁধা ও মুখে পলিথিন মোড়ানো অবস্থায় লাশ উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। ফলে ঘটনার সময় ও স্থান নিয়ে এজাহারে অসঙ্গতি রয়েছে, যা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তালেবুর রহমান জানান, ৮ সেপ্টেম্বর ওয়াসিম নিখোঁজ হওয়ার পর স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নিচতলার পাশের মাটি থেকে ওয়াসিমের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি জানান, এ ঘটনায় মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত কি না, এর প্রকৃত কারণ এবং পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রাথমিকভাবে মাসুমের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ওয়াসিমের সাথে তার আর্থিক লেনদেন ছিল। পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ওয়াসিমকে আঘাত করা হয়। পরে তার হাত-পা বেঁধে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর লাশটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পেছনের একটি সরু গলিতে মাটিচাপা দেয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়া এলাকায় বসবাস করতেন শেখ ওয়াসিম রনী। তবে তার মৃত্যুর সঠিক কারণ, সময় ও ধরন, হত্যাকাণ্ডে অন্য কারও সম্পৃক্ততা এবং লাশ গোপনের পুরো প্রক্রিয়া ময়নাতদন্ত ও তদন্ত শেষ হওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)