Logo
×

Follow Us

সারাদেশ

৭ মাসে প্রায় ১৬ হাজার শিশু নিখোঁজ, মেলেনি সন্ধান

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৩ পিএম

৭ মাসে প্রায় ১৬ হাজার শিশু নিখোঁজ, মেলেনি সন্ধান

ছবি: সংগৃহীত

দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিশু নিখোঁজের এমন ঘটনা। পুলিশ সদর দপ্তরের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন থানায় প্রায় ১৬ হাজার শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। নির্দিষ্ট হিসাবে এই সংখ্যা ১৫ হাজার ৯১৭। সেই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা ৭৫ জনেরও বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিখোঁজ হয়েছে জুন মাসে। 

শিশু নিখোঁজের এমন পরিসংখ্যান নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে তাদের নিরাপত্তা, পারিবারিক সচেতনতা এবং সামাজিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও মানবাধিকার কর্মীরা। তারা বলছেন, নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত ও উদ্ধার অভিযান বিলম্বিত হয়। 

জানা যায়, নিখোঁজ শিশুদের কেউ খেলাধুলার সময় পরিবারের অগোচরে হারিয়ে যাচ্ছে, কেউ আবার বাস বা গণপরিবহন থেকে ভুল করে নেমে গিয়ে আর পরিবারের কাছে ফিরতে পারছে না। আবার প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণের ঘটনাও ঘটছে।

জানা গেছে, নিখোঁজ হওয়া অনেক শিশুকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও কিছু শিশু দীর্ঘদিনেও ফিরে আসছে না। ফলে নিখোঁজ শিশুদের একটি অংশ কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে তাদের খুঁজে বের করা হচ্ছে এবং দীর্ঘদিন পরও কেন অনেকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না- এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।

পুলিশের তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারি মাসে নিখোঁজ হওয়া শিশুর সংখ্যা ছিল এক হাজার ৭৬৮ জন শিশু, ফেব্রুয়ারি মাসে এক হাজার ৩৯২ জন, মার্চে এক হাজার ৭০৮ জন, এপ্রিলে ২ হাজার ৬৬০ জন, মে মাসে ২ হাজার ৫৬ জন, জুন মাসে ৩ হাজার ১৬৩ জন এবং জুলাই মাসে ৩ হাজার ১১ জন। 

এদিকে নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধারে সিআইডি ও অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ‘মুন অ্যালার্ট’ (১৬২১৯) ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এতে টোল-ফ্রি হেল্পলাইন ১৩২১৯ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তথ্য জানানো যায়। মেটা (ফেসবুক)-এর সহযোগিতায় স্থানীয় বিজ্ঞপ্তিও পাঠানো হয়।  বেসরকারি সংস্থা মুন অ্যালার্ট-এর তথ্য বলছে, গেল ছয় মাসে দেশে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। অর্থাৎ, তাদের হিসাবে গড়ে প্রতিদিন নিখোঁজ হচ্ছে প্রায় ১৯ জন শিশু!

রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে এই আতঙ্ক ছড়িয়েছে প্রান্তিক জনপদেও। চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ এবং পাবনা থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এসব এলাকাতেও শিশু নিখোঁজের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় সাতক্ষীরা ও ঝিনাইদহে পাচার চক্রের সক্রিয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এতো বিপুল সংখ্যক শিশু নিখোঁজের পেছনে মূলত পাচার চক্র, মুক্তিপণ আদায় এবং পারিবারিক বিরোধ কাজ করছে। নিখোঁজ শিশুদের একটি বড় অংশ সীমান্ত পেরিয়ে পাচার হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

তবে প্রযুক্তির ব্যবহার ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে দ্রুত উদ্ধার পাওয়ার উদাহরণও রয়েছে। পাঁচ বছরের মুসকান ও আট বছরের সাইফ অপহরণের পর ‘মুন অ্যালার্ট’ (১৬২১৯) এবং বিলবোর্ডে তাদের ছবি ও তথ্য প্রচার করা হলে চাপের মুখে অপহরণকারীরা সদরঘাট এলাকায় শিশু দুটিকে রেখে পালিয়ে যায়। অন্যদিকে আশ্রমে থাকা নুরুন্নাহার নামের এক শিশুকে দীর্ঘ আট বছর পর স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অনুসন্ধানের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যায়। পরে তার মা ও স্বজনদের সঙ্গে পুনর্মিলন ঘটে।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বলছে, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়কে উদ্ধার অভিযানের ‘গোল্ডেন আওয়ার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নিখোঁজের তথ্য যত দ্রুত পুলিশ, সংশ্লিষ্ট সংস্থা, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া যায়, শিশুকে নিরাপদে উদ্ধারের সম্ভাবনাও তত বাড়ে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু থানায় সাধারণ ডায়েরি করার মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে নিখোঁজের পরপরই সমন্বিতভাবে তথ্য প্রচার, প্রযুক্তিনির্ভর চাইল্ড ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এবং আন্তঃথানা যোগাযোগ জোরদার করা প্রয়োজন। একইসাথে পরিবারের সদস্যদেরও শিশুদের চলাফেরা ও নিরাপত্তার বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, শিশুরা শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ায় তাদের সহজেই টার্গেট করা যায়। এ কারণেই অপরাধীরা শিশুদের নিশানা করার প্রবণতা বাড়িয়েছে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের দেশব্যাপী আরও শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতনতা বাড়াতে হবে। 

শিশু নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া গেলে অনেক শিশুকেই অল্প সময়ের মধ্যে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব। তাই নিখোঁজ হওয়ার পর অপেক্ষা না করে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানানোর পাশাপাশি শিশুর ছবি, পোশাক ও অন্যান্য শনাক্তকারী তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য করুন