Logo
×

Follow Us

সারাদেশ

রংপুরে ৪ খুনে মাদকের পাশাপাশি নতুন রহস্য

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩২ পিএম

রংপুরে ৪ খুনে মাদকের পাশাপাশি  নতুন রহস্য

ফাইল ছবি

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় তদন্তে নতুন কিছু বিষয় সামনে এসেছে। শুরুতে ইয়াবা সেবন ও তা দেখে ফেলার ঘটনাকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখন পুলিশের ধারণা, এর পেছনে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, আর্থিক বৈষম্য ও জমি-সংক্রান্ত বঞ্চনার বিষয়ও থাকতে পারে।

রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, মামলায় গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস আদালতে যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তার সাথে সাক্ষীদের বক্তব্যের মিল পাওয়া গেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ২টা থেকে আড়াইটার দিকে তারা সীমান্ত দাসের বাসায় বসে ইয়াবা সেবন করেন। পরে সেখান থেকে তারা ঘটনাস্থলের দিকে যান। সাক্ষী সীমান্ত দাসও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন।

তবে পুলিশের এই কর্মকর্তা মনে করেন, শুধু মাদকের বিষয় দিয়ে হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা ব্যাখ্যা করা যায় না। তার ধারণা, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বা ক্রোধও ঘটনার পেছনে কাজ করতে পারে। পাশাপাশি দুই পরিবারের আর্থিক অবস্থার পার্থক্য এবং জমি নিয়ে পুরোনো বিরোধের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর প্রায় ছয় শতক জমির ওপর নির্মিত বাড়িটির জমি একসময় সিদ্ধার্থ দাসের পূর্বপুরুষদের মালিকানাধীন ছিল। দুই পরিবারের বাড়ি পাশাপাশি। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, একদিকে চক্রবর্তী পরিবারের বাড়ির সীমানাপ্রাচীর এবং অন্যদিকে সিদ্ধার্থদের প্রায় দুই শতক জমিতে টিনের ঘর ও একটি ছোট দোকান রয়েছে।

সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় চন্দ্রের ভাষ্য, ওই আট শতক জমি তার দাদা চন্দ্র মোহন দাসের মালিকানাধীন ছিল। উত্তরাধিকারসূত্রে চার ভাইয়ের প্রত্যেকে দুই শতক করে জমি পান। তার তিন কাকা প্রায় ১৫ বছর আগে নিজেদের ছয় শতক জমি রবি ঠাকুরের কাছে বিক্রি করেন। তবে জমির দলিল গণপতি চক্রবর্তীর নামে করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। রবি ঠাকুরের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।

বিনয় চন্দ্র বলেন, অর্থের অভাবে তারা নিজেদের অংশের জমি ধরে রাখতে পারেননি। দুই শতক জমিতে স্ত্রী, দুই ছেলে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে তিনি বসবাস করেন। তার ছোট ভাই বিজয় দাসের নিজস্ব বাড়ি না থাকায় তিনি পাশের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। সিদ্ধার্থের বড় ভাই পার্থ বিয়ে করার পর জায়গার সংকট তৈরি হলে সিদ্ধার্থ কিছুদিন কাকা বিজয়ের বাড়িতে থাকতেন।

সিদ্ধার্থ ও তার বড় ভাই পার্থ স্বর্ণের দোকানে কাজ করেন। তাদের বাবা মাছের ব্যবসার পাশাপাশি কীর্তনের সঙ্গে যুক্ত, আর মা বাড়িতে একটি মুদি দোকান পরিচালনা করেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা ওই এলাকার পুরোনো বাসিন্দা।

পার্থ দাস দাবি করেন, গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের সাথেতাদের কোনো ঘনিষ্ঠতা ছিল না। পাশাপাশি বাড়িতে বসবাস করলেও দুই পরিবারের মধ্যে কথাবার্তা ছিল সীমিত। দেখা হলে কেবল সৌজন্য বিনিময় হতো বলে জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকেও দুই পরিবারের মধ্যে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি জানা গেছে। তাদের ভাষ্য, পাশাপাশি বাড়ি হলেও চক্রবর্তী পরিবারের সঙ্গে আশপাশের মানুষের খুব বেশি যোগাযোগ ছিল না। আর্থিক অবস্থার পার্থক্যও এই দূরত্বের অন্যতম কারণ হতে পারে বলে স্থানীয় কয়েকজন মনে করেন।

পাশের বাড়ির বাসিন্দা সনেকা দাস বলেন, চক্রবর্তী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্থানীয়দের তেমন মেলামেশা ছিল না। তাদের বাড়িতে সাধারণত কাউকে যাতায়াত করতেও দেখা যেত না বলে জানান তিনি।

এর আগে ২২ আগস্ট গভীর রাতে রংপুরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে পার্থী চক্রবর্তী আগামী (২৫) এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী আয়ুশের (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে রংপুর জেলা স্কুল থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশ মাদক-সংশ্লিষ্ট তথ্যের পাশাপাশি পারিবারিক, সামাজিক ও জমি-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখছে। তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে চার হত্যার নেপথ্যে কোন কারণটি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে, তা আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

মন্তব্য করুন