Logo
×

Follow Us

অন্যান্য

৪৮ বছরে বিএনপি: অর্জনের গৌরব, আত্মসমালোচনা ও আগামীর বাংলাদেশ

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৬ এএম

৪৮ বছরে বিএনপি: অর্জনের গৌরব, আত্মসমালোচনা ও আগামীর বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ৪৮ বছর একটি দীর্ঘ সময়। এই সময়ে দেশের রাজনীতি যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে অর্থনীতি, সমাজ ও মানুষের প্রত্যাশা। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি কঠিন রাজনৈতিক সময়ে। সেই সময়ের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। কিন্তু এই দীর্ঘ পথচলায় বিএনপি দেশের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিএনপির ইতিহাস তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপি কখনো সরকার পরিচালনা করেছে, কখনো বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করেছে, আবার কখনো রাজপথে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। নানা উত্থান-পতন, সাফল্য-ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে দলটি আজ ৪৮ বছরে পা দিয়েছে।

এই দীর্ঘ পথের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো দেশের মানুষের কাছে বিএনপির একটি নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের অংশগ্রহণের রাজনীতিকে সামনে রেখে দলটি তার পথচলা শুরু করেছিল। সময়ের সঙ্গে এই দর্শনেরও পরিবর্তন ও পরিমার্জন প্রয়োজন হয়েছে। ভবিষ্যতে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে সব নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করবে।

বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছিল। পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় রাজনীতির পরিবেশ ফিরে আসে এবং বিএনপি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

এরপর আসে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়। আশির দশকে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতন এবং গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা। এই আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি বিএনপির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৯১ সালের নির্বাচন বিএনপির ইতিহাসে আরেকটি বড় অধ্যায়। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা ফিরে আসে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একজন নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বও ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

বিএনপির বিভিন্ন সময়ে নেওয়া অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগও বাংলাদেশের পরিবর্তনের ধারায় ভূমিকা রেখেছে। কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন, বেসরকারি খাতকে উৎসাহ, শিল্প ও ব্যবসার প্রসার, রপ্তানিমুখী অর্থনীতি, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন কর্মসূচি দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনে অবদান রেখেছে।

বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তির বিস্তার ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্যোগ। এর ফলে অনেক পরিবার তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে উৎসাহিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে নারীর কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ার ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

তবে বাংলাদেশের কোনো অর্জনকে একক কোনো দলের সম্পত্তি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। একটি দেশের অগ্রগতি তৈরি হয় সরকার, রাজনৈতিক দল, উদ্যোক্তা, শ্রমিক, কৃষক, প্রবাসী এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। বিএনপির ইতিবাচক অবদানকে স্বীকার করার পাশাপাশি জাতীয় অর্জনের এই সম্মিলিত চরিত্রকেও সম্মান করতে হবে।

আজকের বাংলাদেশ আগের চেয়ে অনেক বেশি সম্ভাবনাময়। কিন্তু সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। তরুণদের কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, দ্রব্যমূল্য, আয়বৈষম্য এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এখন বড় প্রশ্ন। এখানেই বিএনপির সামনে নতুন সুযোগ।

৪৮ বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দলটি যদি আগামী বাংলাদেশের জন্য একটি পরিষ্কার ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দিতে পারে, তাহলে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হতে পারবে। শুধু অতীতের অর্জন নয়, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে, সেই স্বপ্ন ও পরিকল্পনাও মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে।

রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের আস্থা। আর সেই আস্থা তৈরি হয় ভালো কাজ, দায়িত্বশীল আচরণ এবং জবাবদিহির মাধ্যমে। বিএনপির সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো দলের ভেতরে গণতন্ত্র আরো শক্তিশালী করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবের বাইরে রাখার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা।

নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, সংসদ ও গণমাধ্যম শক্তিশালী হলে কোনো একটি দল নয়, পুরো বাংলাদেশই শক্তিশালী হবে। বিএনপি যদি এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার নেতৃত্ব দিতে পারে, সেটি হবে তার ৪৮ বছরের ইতিহাসে অন্যতম বড় অর্জন।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সংঘাতের সংস্কৃতি থেকেও আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, বিরোধী দলের অধিকার থাকতে হবে। সরকারকে সমালোচনা করার অধিকার থাকতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই, কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন শত্রুতায় পরিণত না হয়।

বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা শুধু রাজনৈতিক স্লোগান শুনতে চায় না। তারা চায় নিরাপদ জীবন, ভালো শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ। নতুন প্রজন্ম বিশেষভাবে জানতে চায়, আগামী বাংলাদেশ কোথায় যাবে।

এই বাস্তবতায় বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে ভবিষ্যতের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা।

জাতীয়তাবাদকে করতে হবে মানুষের মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত। গণতন্ত্রকে করতে হবে মানুষের অধিকার ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। উন্নয়নকে করতে হবে সাধারণ মানুষের জীবনমানের সঙ্গে যুক্ত। আর রাজনীতিকে করতে হবে সেবা ও দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত।

৪৮ বছর একটি দলের জন্য কম সময় নয়। এই সময়ে বিএনপি অনেক অর্জন করেছে, অনেক কঠিন সময় পার করেছে এবং অনেক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এই অভিজ্ঞতাই এখন দলের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং এটি শক্তিশালী নেতৃত্বের পরিচয়। নিজের অর্জনকে স্বীকার করার পাশাপাশি নিজের সীমাবদ্ধতাকে বুঝতে পারাও একটি পরিণত রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্য।

আজ বিএনপির সামনে তাই নতুন একটি অধ্যায় লেখার সুযোগ রয়েছে। সেই অধ্যায় হতে পারে আরও উদার গণতন্ত্রের, আরো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের, আরও স্বচ্ছ রাজনীতির এবং আরো উন্নত বাংলাদেশের।

৪৮ বছরের বিএনপি শুধু অতীতের স্মৃতি নয়। এটি আগামী দিনের সম্ভাবনাও। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই সময়ে তাই প্রত্যাশা একটাই: বিএনপি তার অভিজ্ঞতা, অর্জন ও জনসমর্থনকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার রাজনীতি করবে, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে মানুষ পরিচয়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় সাফল্য ক্ষমতায় থাকা নয়; মানুষের আস্থা অর্জন করা এবং দেশকে আরো ভালো জায়গায় নিয়ে যাওয়া।

৪৮ বছরের বিএনপির সামনে এখন সেই বড় সুযোগই অপেক্ষা করছে। অতীতের অর্জন হোক অনুপ্রেরণা, ভুল হোক শিক্ষার উৎস, আর আগামী বাংলাদেশ হোক নতুন পথচলার লক্ষ্য।

আজিজুর রহমান কিরন

সাংবাদিক ও বিশ্লেষক 

ই-মেইল : azizur.kiron @gmail.com

মন্তব্য করুন