Logo
×

Follow Us

অন্যান্য

প্রশাসনে বদল নয়, বদল দরকার সংস্কৃতির

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৮:২০ পিএম

প্রশাসনে বদল নয়, বদল দরকার সংস্কৃতির

একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতার মুখে যখন প্রশাসনের ভেতরের অনিয়ম, ঘুষ ও দুর্নীতির কথা উঠে আসে, তখন সেটিকে নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হলো প্রশাসন। সরকার বদলায়, মন্ত্রী বদলায়, নীতি বদলায়; কিন্তু প্রশাসনের কাঠামো যদি একই রকম থাকে, তাহলে নাগরিকের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না।

সম্প্রতি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে উঠে এসেছে, সরকারের ভেতরে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনাগুলো আগের মতোই আটকে দেয়া হচ্ছে এবং তিনি যে অর্থবহ পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিলেন, তা এখনো ঘটেনি। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, তিনি বলেছেন, তারেক রহমান ছাড়া আর কারও মধ্যে পরিবর্তন ঘটেনি। এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক মূল্যায়নের বাইরে রেখেও একটি প্রশ্ন সামনে আসে: রাষ্ট্র পরিচালনার যন্ত্রে পরিবর্তনের গতি এত ধীর কেন?

সমস্যাটি কেবল ঘুষ নেয়া বা দুর্নীতির কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আরো গভীরে গেলে দেখা যায়, প্রশাসনের একটি অংশে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা ‘কাজ করাতে হলে তদবির লাগবে, ফাইল চালাতে হলে টাকা লাগবে, নিয়মের চেয়ে পরিচয় বেশি কার্যকর’ ধরনের সংস্কৃতিই বড় বাধা। এই সংস্কৃতি রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে দুর্বল করে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে, সাধারণ মানুষকে হয়রানির শিকার করে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রতি আস্থাও ক্ষয় করে। দুর্নীতি-ঘুষের শিকড় উপড়ে না ফেললে রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন অধরাই থাকবে।

প্রশাসন কি সরকারের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠছে?

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রশাসন সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু বাস্তবে যদি দেখা যায়, সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এক জায়গায় আর বাস্তবায়নের পথে গিয়ে সেটি আটকে যাচ্ছে অন্য জায়গায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা কোথায় এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা কোথায়?

সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই হবে না। সেই সদিচ্ছাকে মাঠপর্যায়ে কার্যকর করার মতো প্রশাসনিক সংস্কারও প্রয়োজন। একটি সরকার যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হতে চায়, অথচ দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তে বছরের পর বছর চলে যায়, তাহলে দুর্নীতিবাজদের কাছে সেটি ভুল বার্তা দেয়। কোনো কর্মকর্তা অনিয়ম করে যদি বদলি হয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে একই কাজ করার সুযোগ পান, তাহলে বদলি শাস্তি নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস মাত্র।

তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘অভিযান’ নয়, প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধব্যবস্থা। ঘুষের বিরুদ্ধে বক্তৃতা নয়, ঘুষের সুযোগ কমাতে হবে। দুর্নীতি বন্ধ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় শুধু দুর্নীতিবাজকে শাস্তি দেয়া নয়, বরং দুর্নীতির সুযোগ কমিয়ে দেয়া।

যেখানে একজন নাগরিককে একটি সাধারণ সেবা পেতে পাঁচটি টেবিলে যেতে হয়, সেখানে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। যেখানে একটি ফাইলের গতিপথ নাগরিক জানেন না, সেখানে তদবিরের সুযোগ তৈরি হয়। যেখানে সিদ্ধান্তের কারণ লিখিতভাবে জানানো হয় না, সেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।

সুতরাং প্রথম কাজ হওয়া উচিত সেবা ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করা। আবেদন, অনুমোদন, ফাইলের অবস্থান, সিদ্ধান্তের সময়সীমা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পরিচয় অনলাইনে দৃশ্যমান করতে হবে। মানুষের সঙ্গে মানুষের অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ যত কমবে, ঘুষের সুযোগও তত কমবে।

করণীয় কোথায়?

প্রথমত, প্রতিটি সরকারি সেবার নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে কাজ না হলে কেন হয়নি, তার লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ফাইল ট্র্যাকিং বাধ্যতামূলক করা দরকার। কোনো ফাইল অকারণে পড়ে থাকলে দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে।

তৃতীয়ত, দুর্নীতির অভিযোগের স্বাধীন ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ করলেই যাতে অভিযোগকারী হয়রানির শিকার না হন, তারও নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

চতুর্থত, বদলিকে দুর্নীতির সমাধান হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। গুরুতর অনিয়মের ক্ষেত্রে তদন্ত, আর্থিক জবাবদিহি এবং প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, সম্পদের হিসাব ও জীবনযাপনের অসামঞ্জস্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। একজন সরকারি কর্মচারীর বৈধ আয় এবং দৃশ্যমান সম্পদের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য থাকলে সেটি তদন্তের যৌক্তিক কারণ হওয়া উচিত।

ষষ্ঠত, সৎ কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দিতে হবে। প্রশাসনে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয় তখনই, যখন অনিয়মের সঙ্গে আপস করা কর্মকর্তা পুরস্কৃত হন আর নিয়ম মেনে চলা কর্মকর্তা একঘরে হয়ে পড়েন। সৎ কর্মকর্তাকে পদায়ন, পদোন্নতি ও দায়িত্ব পালনে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রতিশোধের ভয় থেকে মুক্ত রাখতে হবে।

সপ্তমত, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সীমারেখা স্পষ্ট করতে হবে। প্রশাসনকে সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে, কিন্তু দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে আমলাতন্ত্রও যেন নির্বাচিত সরকারের নীতিকে অদৃশ্য ক্ষমতার মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

সংস্কার মানে শুধু নতুন আইন নয়:

আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, আমরা প্রায়ই মনে করি নতুন আইন, নতুন কমিশন কিংবা নতুন কমিটি করলেই সংস্কার হয়ে যায়। আসলে সংস্কারের সবচেয়ে কঠিন জায়গা হলো মানসিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি বদলানো।

একজন নাগরিক যেন সরকারি অফিসে গিয়ে মনে না করেন, ‘কাকে ধরলে কাজ হবে?’ বরং তাঁর বিশ্বাস হতে হবে, ‘আমার অধিকার আছে, নিয়ম অনুযায়ী আমার কাজ হবেই।’এটিই একটি কার্যকর রাষ্ট্রের মৌলিক পরিচয়।

সরকারের ভেতরে পরিবর্তন আনতে হলে তাই শুধু মন্ত্রী-সচিবের পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। দরকার জবাবদিহির সংস্কৃতি। কে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কেন নিয়েছেন, কত সময়ে নিয়েছেন এবং সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের কত টাকা ব্যয় হয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অংশ হতে হবে।

এখন আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। জনগণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কেবল নতুন মুখ দেখতে চায় না। তারা চায় নতুন আচরণ, নতুন সেবা এবং নতুন রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি। সরকার যদি সত্যিই দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে চায়, তাহলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে সমস্যা আছে। এরপর প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে প্রশাসনিক কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেয়া।

ঘুষখোরের বিরুদ্ধে শাস্তি যেমন প্রয়োজন, তেমনি ঘুষ দেয়ার পরিবেশ তৈরি করে এমন জটিল ব্যবস্থারও সংস্কার প্রয়োজন। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা যেমন দায়ী, তেমনি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও দায় এড়াতে পারে না।

সবশেষে কথাটি খুব স্পষ্ট করে বলা দরকার: সরকার পরিবর্তন রাষ্ট্র পরিবর্তনের সমার্থক নয়। রাষ্ট্র পরিবর্তন তখনই দৃশ্যমান হবে, যখন একজন সাধারণ নাগরিক ঘুষ, তদবির কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই তার প্রাপ্য সরকারি সেবা পাবেন।

আজকের চ্যালেঞ্জ তাই কে কোথায় বদলি হলেন, কে নতুন পদ পেলেন, তা নয়। চ্যালেঞ্জ হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র বদলানো। যে প্রশাসনে ফাইলের গতি নির্ধারণ করবে আইন, টাকা নয়; যেখানে পদোন্নতির ভিত্তি হবে দক্ষতা, আনুগত্য নয়; যেখানে নাগরিকের পরিচয় নয়, তার অধিকারই হবে সেবার ভিত্তি, সেই প্রশাসনই হবে প্রকৃত পরিবর্তনের প্রশাসন।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এখন প্রয়োজন প্রশাসনিক সংস্কারের দ্বিতীয় অধ্যায়। এই অধ্যায় ব্যর্থ হলে জনগণের প্রত্যাশাও ব্যর্থ হবে। আর সফল হলে সেটিই হতে পারে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অর্জন।

আজিজুর রহমান কিরন

সাংবাদিক ও বিশ্লেষক 

ই-মেইল : azizur.kiron @gmail.com

মন্তব্য করুন