মালয়েশিয়া সফর: শ্রমের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন অর্থনৈতিক কূটনীতির যাত্রা
প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সরকারি মালয়েশিয়া সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি ছিল শ্রমশক্তি ও রেমিট্যান্স। কিন্তু সাম্প্রতিক এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক স্পষ্ট করেছে, আগামী দিনের সম্পর্ক আর কেবল শ্রমবাজারকেন্দ্রিক থাকবে না; বরং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিস্তৃত পরিসরে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ খোঁজেন এবং তাদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে শ্রম অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত উচ্চ ব্যয়, দালালচক্রের আধিপত্য, প্রতারণা ও শ্রমিকদের অধিকারহীনতার মতো সমস্যাগুলোও দীর্ঘদিনের। তাই শ্রমিক সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, সাশ্রয়ী এবং মানবিক করার বিষয়ে দুই দেশের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হওয়াই হবে এই সফরের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
সফরের আরেকটি তাৎপর্য হলো অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুণগত পরিবর্তনের উদ্যোগ। মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা, মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টা এবং সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত প্রযুক্তি, হালাল শিল্প ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতার আগ্রহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাংলাদেশ এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে আরও উচ্চতর অবস্থানের জন্য প্রস্তুতি নিতে চায়।
বিশেষ করে মালয়েশিয়ার শিল্পায়নের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান হতে পারে। একসময়ের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি ও উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতিতে মালয়েশিয়ার রূপান্তর বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার ক্ষেত্র হতে পারে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, নীতির ধারাবাহিকতা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, আন্তর্জাতিক সফরের সফলতা কেবল যৌথ বিবৃতি বা সমঝোতা স্মারকের সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না। অতীতে বহু প্রতিশ্রুতি কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। তাই এই সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কত দ্রুত শ্রমবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, কত বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হয় এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেশের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে কী প্রভাব ফেলে তার ওপর।
আঞ্চলিক রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও এই সফরের গুরুত্ব রয়েছে। আসিয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততার আকাঙ্ক্ষা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা বাংলাদেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।
মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার একটি নতুন জানালা খুলে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেয়ার সক্ষমতা। শ্রমের বাজার থেকে প্রযুক্তির বাজারে, রেমিট্যান্সের সম্পর্ক থেকে বিনিয়োগের সম্পর্কের দিকে যাত্রাই হতে পারে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের আগামী অধ্যায়।
আজিজুর রহমান কিরন
সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
ই-মেইল : azizur.kiron @gmail.com
মন্তব্য করুন
logo-1-1772191739.png)