Logo
×

Follow Us

অন্যান্য

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর: শ্রমবাজার পুনরুদ্ধারের নতুন অধ্যায় শুরু হবে কি?

Icon

প্রকাশ ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর: শ্রমবাজার পুনরুদ্ধারের নতুন অধ্যায় শুরু হবে কি?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেয়া নিছক কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, প্রবাসী শ্রমবাজার এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সুপরিকল্পিত বার্তা বহন করে। বিশেষ করে কয়েক বছর ধরে অনিশ্চয়তায় থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে এই সফর নতুন আশার সঞ্চার করেছে। 

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অন্যতম প্রধান গন্তব্য মালয়েশিয়া। লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী সেখানে বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন এবং তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কিন্তু ২০২৪ সালে শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত হওয়ার পর হাজার হাজার সম্ভাব্য কর্মীর বিদেশ যাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এই অচলাবস্থা দূর করা এখন দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। 

প্রধানমন্ত্রীর এই সফর থেকে প্রথম যে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে তা হলো মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আনুষ্ঠানিক ও কার্যকরভাবে পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। এর আগে দুই দেশের আলোচনায় খাতভিত্তিক চাহিদার ভিত্তিতে শ্রমিক পাঠানো, আটকে থাকা কর্মীদের দ্রুত পাঠানোর উদ্যোগ এবং স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা তৈরির বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। 

তবে শুধু শ্রমবাজার খুলে যাওয়াই বাংলাদেশের জন্য সাফল্য হতে পারে না। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, মালয়েশিয়াগামী শ্রমিকদের জন্য অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, সীমিত সংখ্যক নিয়োগ সংস্থার প্রভাব এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করেছিল। তাই এবার আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে হবে কম খরচে, স্বচ্ছ এবং শ্রমিকবান্ধব নিয়োগ ব্যবস্থা। অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও নিয়োগ সিন্ডিকেট ভেঙে ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। 

এই সফরে আরো একটি নতুন দিক উন্মোচিত হতে পারে—কম দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে দক্ষ ও বিশেষায়িত কর্মী পাঠানোর সুযোগ সৃষ্টি। মালয়েশিয়ার শিল্প, প্রযুক্তি, নির্মাণ, সেবা ও উৎপাদন খাতে দক্ষ জনশক্তির চাহিদার সাথে বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সমন্বয় করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স আয়ও বাড়বে এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হবে।

কূটনৈতিক দিক থেকেও সফরটির আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য মালয়েশিয়া হওয়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানেরও ইঙ্গিত দেয়। ভারত ও চীনের মধ্যকার আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে কোনো এক পক্ষকে অগ্রাধিকার না দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাষ্ট্রকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া একটি সুপরিকল্পিত বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। 

তবে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য ভুলে গেলে চলবে না। অতীতে শ্রমবাজার খোলা ও বন্ধ হওয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার পাশাপাশি কার্যকর নীতিমালা, কঠোর নজরদারি এবং দুই দেশের প্রশাসনিক সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র নতুন শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানো নয়, তাদের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

অতএব, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে কোনো চুক্তির সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং এই সফর বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থায় কতটা স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও স্থায়িত্ব আনতে পারে তার ওপর। যদি কম খরচে, দক্ষতাভিত্তিক এবং সিন্ডিকেটমুক্ত একটি নতুন শ্রমবাজার কাঠামোর ভিত্তি তৈরি হয়, তবে এটি শুধু দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ই নয়, বাংলাদেশের লাখো কর্মীর স্বপ্ন পূরণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠতে পারে।

আজিজুর রহমান কিরন

সাংবাদিক ও বিশ্লেষক 

ই-মেইল : azizur.kiron @gmail.com

মন্তব্য করুন